‘একবার যেতে দেনা আমায় ছোট্ট সোনার গাঁয়/ যেথায় কোকিল ডাকে কুহু/ দোয়েল ডাকে মুহু মুহু/ নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়...।’ শাহনাজ রহমত উল্লাহর গাওয়া এই গানটি শুনে আবেগ-তাড়িত হননি এমন মানুষ বোধহয় কমই আছে। তবে সেই ছোট্ট গ্রামে এখন কোকিল ও দোয়েলের ডাক কেড়ে নিয়েছে উন্নয়নের নামে বৃক্ষনিধন, নদী ভরাট এবং আধুনিকতার সব উপসর্গ। আজকের নিবন্ধ এমন কিছু আফসোস থেকে লেখা।
দুই. ২০২৫ সালে গ্রামবাংলায় পা ফেলেই যেন ধাঁধায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কৈশোরে পাঠ্যপুস্তকে পড়া কিংবা দুই-তিন যুগের আগের দেখা গ্রাম আর বর্তমান গ্রামের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ পার্থক্য। এই গ্রাম তো ঠিক সে-ই গ্রাম নয়। পানির কলকল ধ্বনি, বর্ষার জলে টইটুম্বুর নদী ও পুকুর, পাখির কলরব, সারি সারি ছনের ঘর, কুপির টিমটিমে আলো ইত্যাদি তেমন আর চোখ পড়ল না। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ এখন ভরাট হয়ে সোজাসুজি চলছে। মাঠের ধুলাবালিতে গড়াগড়ি, গাছের ডাল থেকে দুঃসাহসিক লাফ, পুকুরে দাপাদাপি ও পানির খেলায় মেতে ওঠার ‘মহোৎসব’ আগের মতো মূর্তিমান নেই; ঐতিহ্যবাহী হাডুডু, গোল্লাছুট এমনকি এক্কা-দোক্কা খেলা আধুনিকতার ধাক্কায় কুপোকাত।
গ্রাম থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে যাত্রা, পালা, জারিগান ও পুঁথিপাঠ। আর নেবেই না কেন আজকাল টিভি ও মোবাইল ফোন উপহার দিচ্ছে ডিসকো গান ও ধুমধারাক্কা সিনেমা এবং সম্ভবত সেই আফসোস থেকে এই গান গাওয়া : ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/আমরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান/ মিলিয়া জারিগান আর মুর্শিদি গাইতাম।’
তিন. সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য বলি, প্রথাগত গ্রামের প্রেক্ষাপটে আমাদের দেখা গ্রামগুলো যে অনেকটা বেখাপ্পা ও বেমানান সে কথা বলা বাহুল্য। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই ব্যবধান আরও একটু পরিষ্কার করে বোঝানো যেতে পারে। দুই দশক আগে কষ্টেসৃষ্টে এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে বড়জোর উপজেলা সদর পর্যন্ত যাওয়া যেত। এখন পিচঢালা মসৃণ পথে মোটরগাড়িতে বেশ কিছু গ্রামে সরাসরি যাওয়া যায় চাই কী বাড়ির আঙ্গিনায়। আজকাল গ্রামে ছনের ঘরের সংখ্যা ব্যাপক কমে আসছে আর কুপি বাতি বিদায়ের প্রহর গুনছে। এমনকি অতীতের মতো নাকে-মুখে রুমাল গুঁজে গ্রামে ঢুকতে হয় না প্রতিটি গ্রামের ৫০-৬০ শতাংশ ঘরে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা এবং প্রায় প্রতিটি ঘরের জন্য সুপেয় পানির বন্দোবস্ত রয়েছে। বসতবাটি যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখার একটা তাগিদ আমাদের চোখ এড়াল না। ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ এমন পরিবেশ যেন সবার কাম্য। অনেক খানায় বিদ্যুৎ সংযোগ এসে গেছে এবং সেই সূত্রে টিভি ও ফ্রিজ; অপেক্ষাকৃত সচ্ছলদের ঘরে রঙিন টিভি ও দামি ফার্নিচার। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারেনি (যেমন : চরাঞ্চল ও দুর্গম গ্রাম) সেখানে সোলার প্যানেল লাগিয়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটাবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। তবে টিভি ও ডিশ উন্নত জীবন-মানের বাহক হলেও অভিযোগ আছে যে সিনেমা, নাটক ও সিরিয়াল কিশোর-কিশোরীদের খোলা মাঠের খেলা কেড়ে নিচ্ছে। টিভির দোষ দিয়েই বা লাভ কী? গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খেলার জায়গাগুলোতে গড়ে উঠেছে বসতি, নার্সারি কিংবা ফসলের আবাদ। ‘একশ বিঘার মাঠটাই এই গ্রামের একমাত্র সম্বল’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেখা সেই গ্রাম আজকাল কেউ দুরবিন দিয়েও খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না। ইদানীং গ্রামে নাটক খুব একটা হয় না, তবে গ্রামের জীবন নানা নাটকীয়তায় ভরা। চলুন তাহলে এমন কয়েকটা নাটকীয় ঘটনার কথা শুনি।
চার. দু-তিন দশক আগেও দোকান বলতে গ্রামের কোনো ছোট একটা ঘরে চাল-ডাল, নুন আর তেলের পসরা। অথচ ২০২৫ সালে এসে আমাদের দেখা গ্রামগুলোতে গড়পড়তা ৪-৫টি দোকান এবং সেই সঙ্গে কোথাও টিভি ও ফ্রিজ। চা, চানাচুর, চিপস, সাবান ও প্রসাধনী, আইসক্রিম, কোমল পানীয়; এমনকি প্রক্রিয়াজাত মসলা দেদার বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় হাট-বাজারের অবস্থা আরও উন্নত এবং শহরের প্রায় সব দ্রব্য ওই সব দোকানে পাওয়া যায়। নাটকীয়তা এসে গেছে দরিদ্রের জীবনেও। সারা দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর একদা যে দিনমজুর সন্ধ্যার পরপর বিছানায় গা এলিয়ে দিত সে এখন চা, পান ও সিগারেট সঙ্গে করে মধ্যরাত পর্যন্ত গ্রামের বা হাটের দোকানে টিভির সামনে বসে থাকে। কোথাও আবার দোকানের এক কোণে ক্যারম বোর্ড পাতা আছে মাঝেমাঝে দিনমজুর, যুবক শ্রেণি ও বেকার পয়সার বিনিময়ে খেলে কিংবা অন্যের খেলা প্রাণভরে উপভোগ করে। রোনালদো, নেইমার, মেসি, শচীন টেন্ডুলকার এখন গ্রামে খুব পরিচিত নাম; খুব দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরাও তরতর করে নাম বলে যেন ওরা ওদেরই সহপাঠী। এমনি করে দু’দশক আগে অচেনা, অজানা পুরো বিশে^র ঘটনাপ্রবাহ এখন গ্রামে থাকা ওই ছোট দোকান ঘরটিতে এক নিমিষে উপস্থিত হয়। সুতরাং, কে বলবে এই গ্রাম সে-ই গ্রাম? স্বভাবতই রবীন্দ্র, শরৎ যুগ এমনকি সত্তরের দশকের গ্রাম-ভাবনা নিয়ে বসে থাকলে হতাশ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তবে অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে, শহরভিত্তিক উন্নয়নের ছিটেফোঁটা রাস্তাঘাট ও বাজারের বদৌলতে গ্রাম-গ্রামান্তরে উপচে পড়ছে (ট্রিকল ডাউন); এককালের বিচ্ছিন্ন ও বিযুক্ত গ্রাম-শহরের কিঞ্চিত রূপ ধারণ করে চলেছে। এই সংযুক্তির সুযোগে খোলা জানালা দিয়ে যেমন নির্মল বায়ু প্রবেশ করছে, তেমনি ঢুকছে মশা-মাছি।
পাঁচ. সাধারণত সিনেমা, টিভি বা নাটকের শুরুতে একটা ডিসক্লেমার বা সতর্কীকরণ নোটিস দেওয়া থাকে। গ্রাম বিবর্তন উপাখ্যানের মূল পর্বে যাওয়ার আগে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও মনে হতে পারে যে, গ্রামগুলো যেন এক ও অভিন্ন। আসলে কিন্তু তা নয়, বিশেষত ভূ-প্রকৃতি ও জীবিকা কৌশলের দিক থেকে এরা একে অপর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বেশিরভাগ গ্রামে ‘দুই সন্তানই যথেষ্ট’ এমন একটা চেতনা বেশ ভালোভাবে গ্রোথিত বলে মনে হয়েছে। ফলে ওই সব গ্রামে খানার সদস্য সংখ্যা বড়জোর ৩-৪ জন; মোট জনসংখ্যায় শিশুর অনুপাত ১০-১২ শতাংশ; কর্মবয়সী জনসংখ্যার অনুপাত বাড়ন্ত এবং প্রজনন হার পড়ন্ত। এর ঠিক উল্টো পরিস্থিতি দেখা যায় কিছু গ্রামে। ‘আল্লাহর আদম আল্লাহ খাওয়াবেন’ এমন রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে সেখানে খানাপ্রতি সদস্য সংখ্যা ৬-৭ জন, প্রজনন হার বেশ উঁচুতে এবং উপার্জনকারীর ওপর ভোক্তার নির্ভরশীলতার অনুপাত অপেক্ষাকৃত বেশি। কোথাও খানার আয়ের সিংহভাগ আসে বৈদেশিক রেমিট্যান্স থেকে (যেমন : মধুরখোলা); কোথাও আবার অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান চাবিকাঠি (যেমন : কবিরকাঠি গ্রাম)। রাজশাহীর তেঘর গ্রামে বর্ষামৌসুমে ৮০ ভাগ জমিতে পানি জমে না অথচ সুনামগঞ্জের পশ্চিম কাশিপুর ৬ মাস প্রায় পানির নিচে থাকে। সাতক্ষীরার পরানদহ তথা অধিকাংশ গ্রামে উফশি ধান কৃষকের প্রাণ, যেখানে খুলনার মাইলমারা গ্রামে উফশির উচ্ছিষ্টও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; তাই বলে মাইলমারার মানুষ না খেয়ে মরছে না। সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে ভারত থেকে আসা ধানের বীজ (যেমন : জামাইবাবু, স্বর্ণা, মিনিকেট) ও সেখানকার কৃষি-জ্ঞান চোরাই পথে এসে চাষির মন কাড়ায় ব্যস্ত। অথচ বাংলাদেশের অন্য কোথাও তেমনটি দেখা যায় না। কী বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস! কী বিচিত্র এই গ্রাম পাঠক! তবে ‘নানা বরণ গাভীরে তোর একই বরণ দুধ’ অর্থাৎ, নানা ধরনের গ্রাম হলেও তাদের উন্নয়নের সিঁড়ি অনেকটা একই রকম : সবুজ বিপ্লব এবং/অথবা উন্নত অবকাঠামো যা মাইকেল লিপটনের ফার্টিলিটি, ফুড ও ফার্মিং পরিবর্তন ব্যাখ্যায় প্রাসঙ্গিক বলে আমরা মনে করি।
ছয়. গ্রামের আর্থসামাজিক রূপান্তর গল্পের নায়কের নাম ‘নয়া ধান’ যা সচরাচর সুধী সমাজে সবুজ বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। বিশেষত সেচের সুবিধা আছে, এমন অঞ্চলের গ্রামগুলোতে জমি, লিঙ্গ ও শিক্ষাভেদে আবালবৃদ্ধবনিতা উফশী (উচ্চ ফলনশীল) বা ‘নয়া ধান’-এর জয়গান ও উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এর পেছনে একটি মাত্র কারণ হলো, শুষ্ক মৌসুমে এই ‘নয়া ধান’ গ্রামবাংলায় নব দিগন্তের সূচনা করেছে বলে তারা মনে করে থাকে। সবুজ বিপ্লবের চাদরে ঢাকা সেচ ও সার নির্ভর উচ্চ ফলনশীল ধান আসার আগে এসব গ্রামের কৃষিজমি ছিল প্রধানত এক ফসলি; খাদ্য জোগানের একমাত্র উপায় ছিল সনাতন জাতের ধান। সবুজ বিপ্লব তথা উফশীর ঢেউতে এখন সেই ধান ভেসে গেছে। দু-একটা গ্রাম ছাড়া এক সময়ের প্রভাবশালী আউশ ধানের অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না; যদি থেকেও থাকে, তবে নিশ্চিতভাবে জাদুঘরে। তাই বলে কিন্তু সনাতন ধানের ‘মৃত্যু’ ঘটেছে, অমন কথা বলা যাবে না কারণ আমন মৌসুমের কিছুটা অস্তিত্ব এখনো আছে। বেশ কিছু গ্রামে কৃষক এ ধরনের ধান করেন মূলত মুড়ি, চিড়া ও পোলাওর চালের জন্য। তা ছাড়া এগুলোর অধিকাংশ বেশি পানিতে কিংবা প্লাবণের পরও কিছু ফসল দেয় এবং রোগ-বালাইয়ের আক্রমণও অপেক্ষাকৃত কম। ফলে অবস্থাপন্ন কৃষক প্রয়োজনের সময় বীজ পাওয়ার জন্য অল্প জমিতে এসব ধানের চাষ বহাল রেখেছে।
সাত. কিন্তু এই ভরসার দিন শেষ প্রায়। মাটি, পানি ও প্রকৃতির ওপর চাপ দিয়ে নয়া ধান দীর্ঘমেয়াদি দুঃখ ডেকে এনেছে। এমনটি বলছেন বিজ্ঞানীরা। সুতরাং সনাতন ধান উৎপাদনে উৎসাহিত করার দিন এসে গেছে। পরিকল্পিতভাবে উপরি স্তরের পানি ব্যবহার এবং কম কীটনাশক ব্যবহার করে ধান উৎপাদনে ব্রতী হওয়া দরকার। নয়া ও সনাতন মিলে দেবে সমাধান একা সমস্যা ডেকে আনবে আরও তীব্রভাবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়