টাকা নিয়েও গবেষণা করেননি ১৬ গবেষক

করোনাভাইরাসের ওপর গবেষণার জন্য ২০২০ সালের আগস্টে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ১৬ জন গবেষক ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা নিয়েও তারা গবেষণা করেননি। তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের ওপর আইআরবির প্রকল্পগুলোতে গবেষণা প্রকল্প প্রদানসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘দ্য রিসার্চ প্রপোজাল অন করোনাভাইরাস ফর রিসার্চ গ্র্যান্ট ২০১৯-২০’-এর আওতায় করোনাবিষয়ক ১৬টি গবেষণার জন্য ১৬ জন গবেষককে ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট ৬০ শতাংশ অগ্রিম হিসেবে ৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ২০ মাস পার হলেও গৃহীত আগাম টাকার সমন্বয় করে পরবর্তী কিস্তি গ্রহণ করা হয়নি এবং গৃহীত আগাম টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর পরিচালিত নিরীক্ষায় এ ঘটনা ধরা পড়ে। পরে অডিট টিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিষয়টির মীমাংসার জন্য চিঠি দেয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ^বিদ্যালয় জানায় যে, ওইসব অর্থের সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়ের কোনো নথি না থাকায় অডিট টিম বিষয়টি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য গত বছর ৩ জুলাই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠায়। অডিট রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয়েও পাঠানো হয়।

জানা গেছে, বিএমইউর ১৬ জন গবেষক করোনাভাইরাসের ওপর গবেষণা পরিচালনার জন্য বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ১ কোটি ৪ লাখ ৫ হাজার ২৫০ টাকা বরাদ্দ চেয়ে বাজেট পেশ করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ-সংক্রান্ত কমিটি ১৬টি গবেষণা কাজের জন্য মোট ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে বলে। এর পরই অনুমোদনকৃত অর্থের ৬০ শতাংশ হিসেবে ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট মোট ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা গবেষণা চলাকালে পরিশোধ করার কথা। কিন্তু যারা গবেষণা করবেন বলে টাকা নিয়েছিলেন তারা গবেষণা করেননি। তারা আগাম গ্রহণ করা টাকাও ফেরত দেননি।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের একজন অধ্যাপক গবেষণার জন্য ১৫ লাখ টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। কমিটি তার গবেষণার জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। পরে তাকে আরও ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু কোনো গবেষণা রিপোর্ট বিশ^বিদ্যালয়ে জমা দেননি অধ্যাপক। এ ছাড়া গবেষণার জন্য ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ তানবীর ইসলাম নিয়েছেন ২ লাখ ৪০ হাজার, কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফখরুল ইসলাম খালেদ ১ লাখ ২০ হাজার, মনোরোগবিদ্যা বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক ১ লাখ ২০ হাজার, হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল আজিজ ৩ লাখ, ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুনিরা জাহান ৩ লাখ, সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা আক্তার ১ লাখ ৫০ হাজার, সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম রাশেদ উল ইসলাম ১ লাখ ২০ হাজার, রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের অধ্যাপক ডা. জেসমিন বানু ৬০ হাজার, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের লেকচারার ডা. মো. মারুফ হক খান ১ লাখ ৫০ হাজার ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামান ৬০ হাজার, ট্রানফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ সাইফুল ইসলাম শাহীন ৩ লাখ, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডা. মো. সোহেল মাহমুদ আরাফাত ৪ লাখ ৫০ হাজার, এনেস্থেশিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম আখতারুজ্জামান ৪ লাখ ২০ হাজার, মেডিকেল অফিসার ডা. কাজী মাকসুদা আক্তার ১ লাখ ২০ হাজার এবং ডা. দ্বীন-ই-মুজাহিদ ৩ লাখেরও বেশি টাকা নিয়েছেন। এই ১৬ জন চিকিৎসক ও শিক্ষক গবেষণার জন্য ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট মোট ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু টাকা নিয়েও সেই গবেষণা করেননি তারা।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) আইন অনুযায়ী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করবেন। কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কর্তৃপক্ষের কাছে কর্তব্যে অবহেলাকারী হিসেবে গণ্য হবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির সম্পূর্ণ অংশ বা অংশবিশেষ সংশ্লিষ্টজনের বেতন থেকে কেটে রাখা হবে অথবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে আদায় করা হবে। কিন্তু বিএমইউর যে ১৬ জন গবেষক টাকা নিয়ে গবেষণা করেননি, তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়নি।

বিএমইউর প্রো-ভিসি (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে মন্ত্রণালয় যাদের রিসার্চ গ্র্যান্ট দিয়েছে তাদের বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে। আমরা ২০১৪ সাল থেকে কী কী রিসার্চ হয়েছে তার তালিকা প্রণয়ন করছি।’