রেলওয়ের পশ্চিম জোনের সর্ববৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ জংশন দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলস্টেশন। ১৪১ বছরের পুরনো এ স্টেশন আজও দেশের রেলপরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতায় দীর্ঘদিনেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এ স্টেশনে। গত কয়েক বছরে পার্বতীপুর রেলস্টেশনের পাঁচটি প্ল্যাটফর্মে কিছু সংস্কারকাজ হয়েছে। পার্বতীপুর উপজেলার সাড়ে চার লাখ মানুষের দাবি খন্ডিত উন্নয়ন নয়, পরিকল্পিত উন্নয়ন চাই।
একসময় পার্বতীপুর স্টেশনে শীতে গরম পানি ও গরমে ঠা-া পানি পাওয়া যেত। স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের উত্তরে একমাত্র পানির ট্যাপটি অনেক দিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ২ ও ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মের তিনটি পানির ট্যাপের নোংরা অবস্থা। ৪ ও ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পানির ব্যবস্থা নেই। পুরনোকালে স্টেশনে ছিল উচ্চমানের ভোজনালয়। একসময় এ স্টেশনের ওপর দিয়ে আন্তঃনগর, মেইল ও লোকালসহ ৫৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করত। এখন আন্তঃনগরসহ প্রতিদিন ৪১টি যাত্রীবাহী ট্রেন চারটি রুটে চলাচল করছে। এখান থেকে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার যাত্রী ওঠানামা করে।
১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ১৩ হাজার ৯৪২ ফুট আয়তনের পাঁচটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশন স্টেশন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। ১৮৮৪ সালে চালু হয় স্টেশনটি। স্টেশনের ৪৪৬ দশমিক ৯৭ একর আয়তনের অপারেশন এরিয়াসহ নিজস্ব ভূমির পরিমাণ ৭৮৮ দশমিক ২৭ একর। আকার ও গুরুত্বের বিচারে এটি ছিল পূর্ব বাংলার সর্ববৃহৎ রেলস্টেশন। চতুর্মুখী এ রেল জংশন স্টেশনের উত্তরে সৈয়দপুর, নীলফামারী ও চিলাহাটি; দক্ষিণে জয়পুরহাট, সান্তাহার, রাজশাহী, ঈশ্বরদী ও খুলনা; পূর্বে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া ও ঢাকা এবং পশ্চিমে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় পর্যন্ত যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন যাতায়াত করে। এ রুটের কাঞ্চন স্টেশন থেকে বিরল স্টেশন হয়ে ভারতের রাধিকাপুর ও কাটিহার দিয়ে আন্তঃদেশীয় মালবাহী ট্রেন চলাচল করে।
পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে অবহেলা ও বৈষ্যমের শিকার হয়েছে পার্বতীপুর রেলস্টেশন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এ রেলস্টেশনের আধুনিকায়নে কেউ এগিয়ে আসেনি। স্টেশনটি নানা সমস্যায় জর্জরিত, যদিও পার্বতীপুরের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। পার্বতীপুরে রয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি, বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম উত্তর-পশ্চিম মৎস্য সম্প্রসারণ প্রকল্প, রেলওয়ের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা, রেলওয়ে ডিজেল কারখানা, পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো (বিপিসি), মাদকদ্রব্য পণ্যাগার, ডাক বিভাগের পোস্টাল মহকুমা, রেলওয়ের হাসপাতাল, পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মিশনারির ল্যাম্ব হাসপাতাল প্রভৃতি।
আওয়ামী লীগ সরকারের চার মেয়াদে মন্ত্রী, সচিব ও রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা এ রেলস্টেশন পরিদর্শন করেছেন। এলাকাবাসী রেলস্টেশনের সমস্যার কথা তুলে ধরলে সংশ্লিষ্টরা শুধু উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। স্টেশনে তথ্য কেন্দ্র নেই, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। প্ল্যাটফর্মে টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। স্টেশনে টিকিটের কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য। ২ ও ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা দুটি উচ্চমানের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই ছিল। স্বাধীনতার কয়েক বছর পরও দুটি হোটেলে যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। পরে দুটিই বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার থাকলেও তারা বসার জায়গা পায় না তালাবদ্ধ থাকার কারণে। বিদ্যুৎ চলে গেলে স্টেশনে বখাটে, মাদকাসক্ত, চোরাচালানি, ছিনতাইকারী ও ছিঁচকে চোরের উপদ্রবে যাত্রীরা অতিষ্ঠ থাকেন।
পার্বতীপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. রফিক চৌধুরী বলেন, ‘স্টেশনে অনেক সমস্যা। ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মুসাফিরখানার টয়লেট ব্যবহার করতে পারেন না যাত্রীরা।’