সংগ্রামী উদ্যোক্তা উম্মে হাসনাতের সাফল্য

‘আর নয় হতাশা, আর নয় ভয়, নারীরাও করতে পারে সবকিছু জয়’।  তেমনি জীবন যুদ্ধে বিজয়ী এক নারী উম্মে হাসনাত খানম। বর্তমানে তিনি একজন অনুপ্রেরণার নাম, তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন নারীরাও মন থেকে চাইলে সবকিছু জয় করতে পারে।

জানা গেছে, তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ভিষ্ণপুর গ্রামের মফছুদার রহমান খানের কনিষ্ঠ মেয়ে উম্মে হাসনাত খানম সুমি জন্মের পর থেকেই জীবন যুদ্ধ করে আসছেন। আট মাস বয়সে মাকে হারান আর আট বছর বয়সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাবাও নিঁখোজ হয়ে যান। বাবা মাকে হারিয়ে খালার স্নেহমমতায় পড়াশুনা শুরু করেন। তবে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় সুমির বিয়ে হয়ে যায়। ফলে লেখাপড়া করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়। 

তিনি বলেন, বাবা-মা না থাকায় স্বামীর সংসারে নির্যাতন নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল আমার। টানাপোড়েনের মাঝে দুটি ছেলে ও একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয় সংসারে। দিন দিন স্বামীর অবহেলা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ দেড়যুগ পড়ে স্বামী নতুন বউ ঘরে নিয়ে আসে, এতে সুমির জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।

উম্মে হাসনাত খানম সুমি বলেন, ‘জীবন যুদ্ধে পিছপা হইনি, সন্তানদের নিয়ে আবার স্বপ্ন দেখা শুরু করি। মহীয়সী নারীরা পারলে আমি কেন পারবো না। ২০১৪ সালে তারাগঞ্জ মহিলা বিষয়ক দপ্তর থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। শুরু করি স্বনির্ভরতার লড়াই। সন্তানদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি নিজেও লেখাপড়ার অদম্য আগ্রহ থেকে এসএসসি, এইসএসসি ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করি। পরে পর্যাক্রমে বিডা, জেডিপিসি, বিসিক, সীপ, ডিজিটাল পল্লী, সত্যদা পল্লী, ব্লক বাটিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আমার আয়ের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে থাকি। বর্তমানে ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে।’
 

তিনি আরও বলেন, ‘বিষ্ণপুর মহিলা উন্নয়ন সমিতি, বিষ্ণপুর যুব উন্নয়ন সংস্থা, হাসনাত হস্ত শিল্প, হাসনাত হস্ত শিল্প বিসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণসহ দুস্থ ও এতিমদের গরু ছাগল বিনামুল্যে বিতরণ করা হয়। এছাড়াও সুবিধা বঞ্চিত নারী ও কিশোরীদের নিয়ে ব্লক বাটি, সেলাই, হস্ত শিল্প, পাটজাত পণ্যের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মাঝে সূচি শিল্প, সপ্তধা পল্লী, শোভা হ্যান্ডিক্রাফট সহ বিভিন্ন শপিং মল হতে কাজ নিয়ে দেয়া হয়। এতে করে প্রায় শতাধিক সুবিধা বঞ্চিত নারীর পরিবার চলছে ও কিশোরীদের মাসিক বাড়তি আয় হচ্ছে।’

সুমি এসব কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে জয়ীতা পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাল্য বিবাহ , নারী নির্যাতন, বৃক্ষরোপন কর্মসূচি, ঝড়েপড়া শিশুদের নিয়ে আগামীতে কাজ করতে চাই। সকলের সহায়তায় আগামীতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান করতে চাই। আমি সমাজের জন্য কিছু করতে চাই যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

তারাগঞ্জ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরে কাওসার জাহান বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের কঠোর পরিশ্রমী নারী উদ্যোক্তা সুমি। কঠোর লড়াই করে বেশকিছু নারীদের নিয়ে সংগঠন করেছেন। কয়েকবার পরিদর্শনও করেছি, আমার দপ্তর হতে নিবন্ধনও পেয়েছেন। আগামীতে সরকারি সহায়তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুমিও পাবেন। এমন নারীদের জন্য শুভকামনা থাকবে সবসময়।’

রংপুর মহিলা বিষয়ক দপ্তরের উপ-পরিচালক সেলোয়ারা বেগম (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, ‘রংপুরে নারী উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মেলাতেও নাম উঠেছে বাংলাদেশের। আগামীতে আরও নারী উদ্যোক্তা ভালো কিছু করবে বলে আশা করছি।’ 

রংপুর যুব উন্নয়নের উপ-পরিচালক আব্দুল ফারুক বলেন, ‘আমার জানা মতে নারী উদ্যোক্তা সুমি একজন সফল সংগঠক। পুরুষদের পাশাপাশি নারী হয়ে তিনি সমাজে দৃষ্টান্ত গড়েছেন।’