ইন্টারনেট বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ

পৃথিবীর  উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মতো, বাংলাদেশেও ইন্টারনেট এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিস্ময়কর হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৯৫ সালে অফলাইন ই-মেইল-এর মাধ্যমে প্রথম এ দেশে সীমিত আকারে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু ইন্টারনেট সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে, অনলাইন ইন্টারনেট চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়। তখন ইন্টারনেটে যুক্ত হতে কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর ভি-স্যাট (ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো। দেশে ভি-স্যাট পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড বিটিটিবির (বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি বা বিটিসিএল) হাতে।

ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তিতে জনগণের প্রবেশাধিকার এবং ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জুলাই নাগাদ বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ১৯ লাখে পৌঁছে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১৭ কোটি হয়, তাহলে মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ২০২০ সালের মে পর্যন্ত ইন্টারনেট মূলত ২টি সাবমেরিন কেবল     সি-মিইউ-৪ এবং ৫ দ্বারা বাংলাদেশে সরবরাহ করা হতো। যার ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে যথাক্রমে ৩০০ ও ১৮০০ জিবিপিএস। বাংলাদেশে এখন যে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হয়, তা সাবমেরিন কেবলনির্ভর। অর্থাৎ সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে তারের মাধ্যমে ব্যান্ডউইডথ এনে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা (আইএসপি) মানুষকে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। কিন্তু স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা দেয় স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। মূল প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ইন্টারনেট-সেবা জিওস্টেশনারি (ভূস্থির উপগ্রহ) থেকে আসে, যা ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার ওপর থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপিত হাজার হাজার স্যাটেলাইটের সমষ্টি হচ্ছে স্টারলিংক, যা পুরো বিশ্বকে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দিতে পারে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টারলিংক বাংলাদেশে এলে দুর্গম এলাকায় খুব সহজে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যাবে। ফলে ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে  গ্রাম ও শহরের পার্থক্য একেবারেই ঘুচে যাবে। এর মানে  গ্রামে বসেই উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সিংসহ ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ করা সম্ভব। আবার কোনো দুর্যোগের পর, দ্রুত যোগাযোগ প্রতিস্থাপনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে স্টারলিংক। যে কারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলন। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আগামীকাল পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করা হবে। সেখানে উপস্থিত সব অংশগ্রহণকারী সেটি ব্যবহার করতে পারবেন। এ ছাড়া স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করে সম্মেলনের সরাসরি সম্প্রচার হবে। রবিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫’ উপলক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এ কথা জানান। এছাড়া মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার সঙ্গে চুক্তি হবে। আগামীকাল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন এবং অংশগ্রহণকারী শীর্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পৃথক বৈঠক করবেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের স্টারলিংক প্রকল্প। এবার বাংলাদেশেও স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর পথে। সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অন্যান্য কার্যক্রম চলছে। বলা হয়েছে, আগামীকাল ৯ এপ্রিল থেকে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু হবে, যা পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। স্টারলিংক একটি লো-অরবিট স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা, যা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা হাজার হাজার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করে। এটি প্রচলিত ফাইবার অপটিক এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের চেয়ে ভিন্ন। কারণ এখানে ভূ-স্থাপিত টাওয়ারের পরিবর্তে সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায়। স্টারলিংকের মতো নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট (এনজিএসও) নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে। উচ্চগতির এবং কম-বিলম্বিত ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে বলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য সুখবর।