শ্রদ্ধায় ও স্মরণে পালিত হলো মাটি ও মানুষের কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ১১৬তম জন্মজয়ন্তী। কবির জীবন ও কর্মের নানা দিক স্মরণ করে ও শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তারা বলেছেন, সরকারিভাবে তার জন্মদিন পালনের কোনো উদ্যোগ নেই। অবহেলায় থাকা তার সমাধিস্থল সংরক্ষণের ও নষ্ট হওয়ার হাত থেকে তার পাণ্ডুলিপি বাঁচানোরও কোনো উদ্যোগ নেই।
গত শুক্রবার (১১ এপ্রিল) জন্মস্থান ময়মনসিংহে বিভিন্ন সংগঠন নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে কবির জন্মজয়ন্তী পালন করেন। এসব অনুষ্ঠানে কবির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করা হয়।
জাতীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চ
ময়মনসিংহের মুসলিম ইন্সটিটিউটে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে সংগঠনটি। অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ জাতীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম মিথুনের সঞ্চালনায় মঞ্চের সভাপতি ও ময়মনসিংহ ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আজিজুল হাই সোহাগের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সাংস্কৃতিক মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি ও দৈনিক ডেসটিনির সম্পাদক কবি গবেষক মাহমুদুল হাসান নিজামী।
এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- কবি শামসুল ফয়েজ, কবি সোহরাব পাশা, কবি নজরুল হায়াত, ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এম এ হান্নান খান, জেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ ইউসুফ লিটন, কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন পাঠান, কবিপুত্র নঈম মাশরেকী, কবি জালাল উদ্দিন আহমদ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল নাকীব, কবি শামীম আশরাফ, কবি শহীদুল ইসলাম সেলিম, আব্দুর রাজ্জাক, ওমর ফারুক আহাম্মেদ, আবুল খায়ের প্রমুখ।
আলোচনায় বক্তারা জানান, ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হতো। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে ১৯৯২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাকে নিয়ে নানা অনুষ্ঠানমালা প্রচার হতো। বাংলাদেশ টেলিভিশন কার্যালয়ে সংরক্ষিত ছিলো তার ছবি এবং কবির লিখা গান, গীতিনাট্য, থেকে তৈরি চলচ্চিত্রের গান নিয়মিতই প্রচারিত হতো। তার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল সেই সময়ে। এরপর দেশে নতুন সরকার গঠন হলে জন্মদিন পালনের জন্য সরকারি বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা করার অজুহাতে ভেঙে ফেলা হয় কবির সমাধির একাংশ।
বক্তারা আরও বলেন, কবি মাশরেকী বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অথচ এই কালজয়ী স্রষ্টার যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও অধরা।
বক্তারা অনতিবিলম্বে তাকে ২১শে পদক ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করার আহ্বান জানানো হয়।
বীক্ষণের ২১৪৪ তম আসরে কবিকে স্মরণ
সকাল এগারোটায় ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র প্রকল্প বীক্ষণ আসরে বরেণ্য সাহিত্যিক আবদুল হাই মাশরেকী স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ডেসটিনির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কবি ও গবেষক মাহমুদুল হাসান নিজামী। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি অধ্যাপক নজরুল হায়াত, কবি অধ্যাপক গাউসুর রহমান, কবি ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আসাদ উল্লাহ এবং আবদুল হাই মাশরেকীর সন্তান সাংবাদিক নাঈম মাশরেকী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি অধ্যাপক সোহরাব পাশা ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক স্বাধীন চৌধুরী।
আলোচনা সভায় কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী বলেন, কবি আবদুল হাই মাশরেকী কালোত্তীর্ণ লেখা রেখে গেছেন- যা বাংলা সাহিত্যে অমূল্য সম্পদ। তাকে নিয়ে অপরাজনীতি করা হয়েছে। সময় তার সদুত্তর দেবে নিশ্চয়ই।
কবি নজরুল হায়াত বলেন, রবীন্দ্রউত্তর তিরিশের কবিদের মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক কবি আবদুল হাই মাশরেকী। তিনি একজন আধুনিক কবি হিসেবে লোক জীবনধারাকে উপজীব্য করেছেন সৃজনসুষমায়।
কবি গাউসুর রহমান বলেন,আবদুল হাই মাশরেকী অত্যন্ত গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। সহজ-সরল জীবন যাপন করে গেছেন আমৃত্যু। তৃণমূল মানুষের সাথে মিলেমিশে একাকার হতে পেরেছিলেন বহুমাত্রিক এই লেখক। পুরস্কার প্রাপ্তির জটিল পথ অনুসরণ করেননি তিনি। তাকে সম্মানিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং দায়।
কবি ও প্রাবন্ধিক আসাদ উল্লাহ বলেন, গুণীর সম্মান এ জাতি আজও সঠিকভাবে করতে জানে না বলেই আবদুল হাই মাশরেকীর মতো মহৎপ্রাণ সাহিত্যিকরা অবহেলিত থেকে যান। তাঁর উত্তরসুরি হিসেবে এ দায় আমাদেরও।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব এ গুণী মানুষকে সম্মাননা জানিয়ে ছিলো, আমি তার প্রস্তাবক ছিলাম। এতো কাল পরে হলেও অন্তত মরোণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদক প্রদান করার দাবি জানাচ্ছি।
ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক স্বাধীন চৌধুরী তার প্রারম্ভিক বক্তব্যে বলেন, একজন আবদুল হাই মাশরেকী সময়োত্তীর্ণ প্রতিভা, মহৎপ্রাণ সৃজন ও মননশীলতায় পরিপূর্ণ সব্যসাচী লেখক। কিন্তু তিনি আজও রাষ্ট্রীয় পদক পাননি।
কবি আবদুল হাই মাশরেকীর সন্তান সাংবাদিক নাঈম মাশরেকী বলেন, আমার বাবা কবি আবদুল হাই মাশরেকীকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তার মৃত্যুর পর রেডিও-টেলিভিশনে নিয়মিত যে প্রোগ্রাম করতো, পরবর্তী সময়ে একদল সাহিত্য সংস্কৃতিকর্মী, সংগঠক এবং সরকারের ছায়াপুষ্টরা কান ভারী করে তা বাতিল করে দেয়।
কবিপুত্র বলেন, আমার বাবার লেখা অন্যরা চুরিও করেছেন এবং তাকে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।
আব্বাস উদ্দিন, আবদুল আলীসহ বরেণ্য গায়ক শিল্পীরা তার গান করেছেন। কবিতা, গান রচনা ও গানের সুর,জারী,গল্প,পালাগান, নাটক,প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। কিন্তু কোন সম্মাননা-পদক পাননি,এটা আমাদের দুঃখের কারণ।
সভাপতির বক্তব্যে কবি সোহরাব পাশা বলেন, আবদুল হাই মাশরেকী কালজয়ী প্রতিভা, অসাধারণ ব্যাক্তি মানস তাঁর। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তার সান্নিধ্যে আলোকিত হয়েছি।
আবদুল হাই মাশরেকীর কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন শেখ মাহবুব এবং টিপু চৌধুরী, স্বর্ণা চাকলাদার, জিসি দেব প্রমুখ।