সাক্ষাৎকারে সালাহউদ্দিন

সংস্কারের বাহানা নয়, ডিসেম্বরেই নির্বাচন দিন

নির্বাচনের বিকল্প ‘উন্নয়ন-সংস্কার’ নয়। গণতন্ত্রই একমাত্র পথ এমনটাই মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমনটি জানিয়েছেন।

বিএনপির অন্যতম এই নেতা বলেন, আগে শুনতাম উন্নয়ন আর উন্নয়ন এখন শুনি সংস্কার আর সংষ্কার। তার মতে, গণতন্ত্রের বিকল্প কেবল গণতন্ত্র উন্নয়ন কিংবা সংস্কার দিয়ে তা থামানো যাবে না। নির্বাচন ঘিরে সরকার পক্ষের বক্তব্য ও পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিহার সরকার অংকুর

প্রশ্নঃ নির্বাচনের সময় নিয়ে আলোচনায় চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুন মাসের কথা সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। বিএনপি কি এতে সন্তুষ্ট?

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা গতবার মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে প্রধানতম বিষয় হিসেবে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সরকার সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। আমরা তাকে অনুরোধ করেছিলাম এটা আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে। প্রেস সেক্রেটারির মাধ্যমে নয়। বলেছিলাম নির্বাচন কমিশনকে অফিসিয়ালি ইন্সট্রাকশন দেবেন যাতে তারা ডিসেম্বরের মধ্যে অথবা তার আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে।

প্রশ্নঃ সরকার কি সেই নির্দেশনা দিয়েছে বা এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনও নজির তৈরি হবে বলে মনে করেন?

উত্তরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের উপস্থাপিত দুটোর কোনোটাই না পাওয়ায় ইতোমধ্যে অনেক রকম বক্তব্য আমাদের কাছে এসেছে। যা শুনে মনে হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে একটা ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দেশে একটা অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরায় বিলম্ব করার চেষ্টা বিভিন্ন মহলের দিক থেকে আছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। ধীরে ধীরে এখন তা দৃশ্যমান হচ্ছে।

প্রশ্নঃ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন- জনগণ ৫ বছর ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। আপনি সেই বার্তা পেয়েছেন?

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কয়দিন আগে বলেছেন- জনগণ নাকি তাদের পাঁচ বছর ক্ষমতায় দেখতে চায়। গতকাল আরেকজন উপদেষ্টা বলেছেন- তারা নাকি গণঅভুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত। তারা যে নির্বাচিত নয়, এই কথাটি সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করেন সেই উপদেষ্টা। দেখা গেছে সেই উপদেষ্টার স্বামী একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক চিন্তক। উনি বক্তব্য দিয়েছেন যে গণতন্ত্রের নামে, নির্বাচনের নামে রাজনৈতিকভাবে লুটেরা সমাজই ক্ষমতায় আসে। এটি প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে দুই-একজন প্রফেসর ইউনূস সাহেবকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় দেখতে চান। এতে আমাদের মনে হয়েছে নির্বাচন ও গণতন্ত্র উত্তরণের প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করতে বিভিন্ন মহল থেকে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চলছে।

প্রশ্নঃ সংস্কার ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে?

উত্তরে সালাহউদ্দিন- আমরা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সবসময় মূল্য দিতে চাই। সেই জন্য গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সংসদের বিকল্প নেই। সাংবিধানিক এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেসমস্ত অধিকারগুলো হরণ করা হয়েছিল সেগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক সরকার ও সংসদ চাই। এটা একমাত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জাতীয় সংসদে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কথাগুলো আমরা জাতির সামনে অনেকবার বলেছি।

প্রশ্নঃ সংসদ ছাড়া সরকার গঠন ও মেয়াদে কোনও প্রভাব পড়ে?

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টাকে আমরা বলেছি দীর্ঘদিন একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে অর্থনৈতিক চাকায় গতিশীলতা আসে না, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ বিভিন্ন পক্ষ নিতে পারে, যা বিগত সময়ে হয়েছে। অগণতান্ত্রিক শক্তির উদয় হয়েছে এই সুযোগে। তাই আমরা বারবার বলেছি, ১৬ এপ্রিল দেখা করে এগুলো আবার বলব। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দেওয়া হয়েছিল তা যেন অফিসিয়ালি করেন।

প্রশ্নঃ নির্বাচন, উন্নয়ন ও সংস্কার- এই তিন শব্দের সম্পর্কগুলো কিভাবে দেখেন?

এর জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন একটি স্বীকৃত পন্থা। নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার, অনির্বাচিত সরকার, ফ্যাসিস্ট হাসিনা নির্বাচনের বিকল্প হিসেবে উন্নয়নকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের শাসক আইয়ুব খানও তার দশককে উন্নয়নের দশক হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থানের চেষ্টা করেছিলেন। একই বক্তব্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশে পুনরায় উচ্চারণ করেছিলেন, যা মানুষ কখনোই গ্রহণ করেনি। উন্নয়ন, সংস্কার এগুলো সবসময় চলমান ও ধারাবাহিকতা থাকে। সংস্কার এমন জিনিস সমাজ ও মানুষের চাহিদের প্রেক্ষিতে সময়ে সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তনটা নিয়ে আসতে হয়। এটা গণতন্ত্রের বিকল্প সেটা ভ্রান্ত ধারণা। গণতন্ত্রের মধ্যেই আছে জনগণের অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের চাহিদা অনুসারে সবসময় সমাজে বিবর্তন হবে, পরিবর্তন হবে, সংস্কার হবে এটাই গণতন্ত্রের ভাষ্য। আর এখন যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেটার প্রবর্তক তো বিএনপি। এই সরকার প্রতিষ্ঠার দেড় বছর আগে ৩১ দফা আমরা উপস্থাপন করেছি। এই দফাগুলো রাজনৈতিক কাব্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কারের বাহানা করে যদি কেউ গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াটি বিলম্ব করতে চায় আমরা তাদের বলব গণতন্ত্রের বিকল্প কেবল গণতন্ত্র।