আজ ১৪ এপ্রিল, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শিবপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে পানাউল্লাহরচর এলাকায় সংঘটিত মর্মান্তিক গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে ব্রাশফায়ার চালিয়ে পাঁচ শতাধিক (মতান্তরে ৭-৮ শত) নিরস্ত্র নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতদের অনেকের মরদেহ তখন ভয়ে কেউ দাফন করতে পারেননি। পরে তাদের গণকবর দেওয়া হয় ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরেই।
বর্তমানে সেই বধ্যভূমিতে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও, আজও ওই শহীদদের কোনো নামের তালিকা তৈরি করা হয়নি কিংবা তা বধ্যভূমি এলাকায় টানানো হয়নি। এতে স্থানীয়দের মাঝে চরম দুঃখ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন, হালখাতার উৎসব চলাকালীন পাক হানাদার বাহিনী প্রথম ভৈরবে আক্রমণ চালায়। আকাশ, নদী ও রেলপথে তাদের আগমন ঘটে। শহরে প্রবেশ করেই তারা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগ চালায়। হেলিকপ্টার থেকে নামা ছত্রীসেনারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে শহরের বিভিন্ন পথে প্রবেশ করে। শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহরচরের খেয়াঘাটে তারা প্রাণভয়ে পালাতে থাকা নিরস্ত্র মানুষদের লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
সেদিনের ভয়াল স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা, বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. ফারুক জানান, তিনি ও তাঁর বাবা ওই ঘাটে ছিলেন নদী পার হওয়ার অপেক্ষায়। পাকবাহিনীর হামলার সময় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও, তাঁর বাবা—বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা আবু সাঈদ শহীদ হন। তিনি জানান, দুই থেকে আড়াই শত লোককে খুব কাছ থেকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। আমার বাবার বুকটা বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো। আজও সেই ভয়াবহ দৃশ্য তাড়া করে ফেরে আমাকে।
ভৈরব বাজার এলাকার ব্যবসায়ী আলহাজ্ব কবির আহম্মেদ মজনু জানান, সেদিন তিনি দাদী দিলজান বিবিকে নিয়ে ঘাটে ছিলেন। পাক সেনারা যখন ঘনিয়ে আসে, তখন তাঁর দাদী বলেন, ‘তুই ভাই সাঁতরে পালা, আমি বুড়ো মানুষ। আমাকে মারবে না।’ কিন্তু হানাদার বাহিনীর বুলেট তাঁর দাদীকেও রেহাই দেয়নি। মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মগজ বের হয়ে আসে। এই স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তাঁর দাদীর শহীদের মর্যাদার দাবি জানান।
স্থানীয় নাট্যকর্মী সবুজ সারোয়ার জানান, ১৯৯০ সালে তাঁদের সংগঠন "ভৈরব থিয়েটার" শহীদদের নামের তালিকা তৈরির জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করলেও, উপজেলা প্রশাসন থেকে উদ্যোগটি বন্ধ করার অনুরোধ আসে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, প্রশাসনের পক্ষ থেকেই তালিকা প্রস্তুত করা হবে। কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি প্রশাসনের প্রতি তালিকার কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে তৎকালীন বিএনপি সরকার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় দলীয়ভাবে আরও অনুদান সংগ্রহ করে বধ্যভূমির ২৯ শতাংশ জমি ভরাট ও বাউন্ডারি ওয়ালসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে শহীদদের নামের তালিকা তৈরি এবং একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণসহ নদীতীরবর্তী পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শবনম শারমিন জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অচিরেই শহীদদের নামের তালিকা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।