মাদক কেলেঙ্কারিতে বদলির পরও বহাল তবিয়তে এডি তুষার

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সহকারী পরিচালক তুষার কান্তির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন তারই অধস্তন কর্মকর্তারা।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অফিসে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, পতিত সরকারের নেতাকর্মীদের প্রটোকল প্রদান ও বিদেশ পালাতে সহায়তা, নিয়মিত ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকা, ডিউটি ফ্রি শপের মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশগ্রহণ এবং মাদক পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ। এছাড়া, ঢাকার বাইরে কর্মকালেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির কারণে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব অভিযোগ তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাকে বিমানবন্দর থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ জারি করা হয়। তবে, নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানে বহাল তবিয়তেই অবস্থান করছেন এবং নিজের পদে থাকার জন্য দেন-দরবার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অধিদপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বদলিসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবুও তিনি বহাল থাকায় সহকর্মীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক তুষার কান্তি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য না মিথ্যা আমি বলবো না। আমি সরাসরি কোনো মিডিয়ায় কথা বলতে পারি না। অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে পরে কথা বলবো।’

অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আদেশ কার্যকর করা হবে।’

তথ্য অনুযায়ী, তুষার কান্তি ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে যোগদানের পর থেকেই অধস্তন কর্মকর্তারা আতঙ্কে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, তিনি অফিসে প্রতিহিংসাপরায়ণ ও হিংস্র আচরণের জন্য পরিচিত।

একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে জানা যায়, সহকারী দারোগা রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে তুষার কান্তি মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে হেড অফিসে শাস্তিমূলক সুপারিশ করেন। তবে, পরবর্তীতে তদন্তে অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে তুষার কান্তির বিরুদ্ধেই কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে হেড অফিস। ওই চিঠিতে সহকারী পরিচালক কাসফিয়া আলম বলেন, ‘অধস্তন কর্মচারীকে মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি করায় কেন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?’

রবিউল ইসলাম জানান, তুষার কান্তি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে আমি তাকে মারতে গিয়েছিলাম। কিন্তু হেড অফিস তদন্তে অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। বরং আমাকেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, আমি তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছি হেড অফিসে, তারপরও সে বহাল তবিয়তে আছে। আমার কিছু করার নেই।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ মার্চ বিমানবন্দরের নকশীকাথা লাউঞ্জে তুষার কান্তি একটি নৈশভোজে অংশ নেন, যেখানে ডিউটি ফ্রি শপের ৬ মালিককে ডেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। উল্লেখ্য, ওই অনুষ্ঠানের খাবারের বিলও তিনি পরিশোধ করেননি, যা নিয়ে বিমানবন্দরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়াও, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সাবেক সরকারের নেতাকর্মীদের বিদেশে পালাতে সহায়তা করা এবং নিজ অফিস থেকে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি অধস্তনদের দিয়ে ডিউটি ফ্রি শপ থেকে মদ ও বিয়ার পাচারেরও অভিযোগ উঠেছে।

অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখা সূত্রে জানা যায়, পঞ্চগড়ে কর্মরত থাকাকালেও অফিসের কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যোগদানের পর তিনি অধস্তনদের মাদক পাচারের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবশেষে, সদর দপ্তরের তদন্ত শেষে এক চিঠিতে জানানো হয়, তাকে বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু এখনো সে আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সহকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।