মানুষ প্রকৃতির ওপর নানাভাবে খবরদারি করছে। খাল-বিল-নদী দখল করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে সমতল ভূমি। কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে ঘরবাড়ি বানিয়ে। নানাভাবে চলছে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার। ফলে বৈরী হয়ে উঠছে প্রকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে ষষ্ঠ স্থানে। তাপমাত্রা ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে দেশে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা ইত্যাদির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি। পাল্টে যাচ্ছে ঋতুর ধারাক্রম। মানুষের চিরচেনা স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ আজ ব্যাহত। করোনা মহামারীতে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এরপরও নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে মানুষ। সেটি হচ্ছে প্রকৃতির আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়া। এই দু-তিন বছরে মানুষের সর্বগ্রাসী অত্যাচার থেকে অনেকটাই রক্ষা পেয়েছে প্রকৃতি। জনবহুল পর্যটন স্পটগুলো জনশূন্য হওয়ায়, সেখানকার পশুপাখি নিরাপদে ঘুরে বেরিয়েছে। কলকারখানা বন্ধ থাকায় দূষণ কমেছে। কমেছে কার্বন নিঃসরণ। শুধু চীনেই ২০ শতাংশ গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে ১০ শতাংশ। ফলে জলবায়ু বিশুদ্ধ হয়েছে। প্রাণভরে শ্বাস নিতে পেরেছে মানুষ। ধুলায় ধূসর ঢাকা, দিল্লি ও বেইজিংয়ের আকাশ পরিষ্কার ছিল। কোভিড ১৯-এর অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে, প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বন্ধ করে তার কাছে ফিরে যাওয়া। সহাবস্থান না করে অত্যাচার চালালে মানুষও যে টিকতে পারবে না এটিই যেন বলে দিয়েছিল করোনা মহামারী। সে কারণে পরিবেশ রক্ষা এবং সচেতনতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমাদের সমাজ রাজনীতি প্রভাবিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধসহ অন্য বিষয়ে সাংবাদিকতা যতটা গুরুত্ব পায়, পরিবেশ সাংবাদিকতা ততটা পায় না। অথচ অস্তিত্বের স্বার্থেই পরিবেশ সাংবাদিকতার বিকাশ জরুরি।
দুই. ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই...’ নজরুল তার গানে পাহাড় আর আকাশের মিতালীর এই উপমা ব্যবহার করেছিলেন। সেটা চট্টগ্রামের পাহাড়কে দেখে। কিন্তু পাহাড়গুলোর আজ সত্যি হেলান দেওয়া অবস্থা। ভূমিখোকো মানুষ পাহাড়ের শরীর কেটে কেটে এতটাই শীর্ণকায় করে ফেলেছে যে, পাহাড়গুলোর দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, একটু ঝড়-বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হচ্ছে। পাহাড়ের আলগা শরীর খসে পড়ছে। এতে বছর বছর ঘটছে প্রাণহানি। দেখা দিচ্ছে মানবিক বিপর্যয়। ফি বছর এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলেও কারও কোনো হুঁশ নেই। বরং লোভ ও লালসা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। সর্বগ্রাসী মানসিকতার কাছে হার মানছে সব। প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের। আমাদের দেশে এমনিতেই নানাবিধ প্রাকৃতিক কারণে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্বিচার অত্যাচারের কারণে প্রকৃতিও যেন বৈরী হয়ে উঠেছে। ফলে প্রকৃতির মধ্যেও যেন দেখা দেয় প্রতিশোধ পরায়ণতা। পাহাড়ের ঢালুর নিচে যেসব অসহায় মানুষ বসতি স্থাপন করে, সেখানে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়। অকাতরে প্রাণ যায় ভাগ্যাহত মানুষের। পাহাড় প্রাকৃতিক সম্পদ হলেও আশ্চর্যজনক হচ্ছে, এই পাহাড়েরও মালিক আছে! এই তথাকথিত মালিকরাই পাহাড় কেটে মাটি লুট করে। পাহাড়ের ঢালু জায়গায় অসহায় মানুষদের থাকতে বাধ্য করে। এদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় হয়। এতে রয়েছে মোটা অংকের বাণিজ্য। সরকার যাবে সরকার আসবে। কিন্তু পাহাড় দখলকারীদের গায়ে ফুলের টোকা পড়বে না। কারণ যারা দখলদারিত্ব চালায় তারা জানে ভাগভাটোয়ারা কোন পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়। তাই খোদ সরকারের নির্দেশও কার্যকর হয় না।
সরকারিভাবে গঠিত তিনটি বিশেষজ্ঞ কমিটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও কক্সবাজার পৌরসভার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ কার্যকর হয়নি আজও। শুধু তাই নয়, পাহাড় না কাটার কোনো নির্দেশও বাস্তবায়ন হয়নি। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫) ও (সংশোধিত) ২০১০-এর ৪ নম্বর ধারার ৬-খ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃক সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাইবে না।’ শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় আইনে পাহাড় কাটার জন্য দুই বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু পাহাড় কাটা বা ধসের কারণে শত শত মানুষের জীবন গেলেও এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো নজির নেই। লাখ লাখ বছরের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য এই পাহাড়গুলোর বেঁচে থাকটাও সমান জরুরি। কিন্তু মানুষ তার হিংস্র থাবা বসিয়েছে পাহাড়ের ওপর। বাংলাদেশ এমনিতেই ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে। তার ওপর পাহাড় কাটার কারণে ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ছে। দিন দিন আমাদের জলাময়গুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা দখলের ষোলোকলা পূর্ণ করেছে। এর পানিও এখন মারাত্মক বিষাক্ত। ঢাকার চারপাশের অপর তিন নদীর অবস্থাও সঙ্গীন। দখল দূষণের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান এবং সামান্য জেল-জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে সব। অথচ পরিবেশ সচেতনতার এই যুগে নদী-খালের দখল দূষণ বন্ধ এবং যথাযথভাবে তা রক্ষা করা সময়ের দাবি। এমনকি দখল-দূষণ বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে। তাতে রোগের সাময়িক উপশম হলেও ক্যানসারের মতো স্থায়ীভাবে চেপে বসা রোগ থেকেই যায়।
তিন. বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির ওপরই এদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশেষ করে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে যে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের দরকার, তা আসে কৃষিজমি থেকেই। কিন্তু দিন দিন জমি কমে যাচ্ছে। এতটাই দ্রুত কমছে যে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় কৃষিজমি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দরকার হলে আইন করে হলেও কৃষিজমি রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিই কৃষিজমি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ঘরবাড়ি। যার অধিকাংশ তৈরি হচ্ছে কৃষিজমিতে। এ ছাড়া জনসংখ্যা বাড়ার প্রভাব পড়ছে অন্যান্য ক্ষেত্রে। নতুন রাস্তাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ করতে হচ্ছে। বাড়ছে শিল্পকারখানা। এসবের জন্য কৃষিজমিই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীভাঙনের ফলেও কৃষিজমি কমছে। এসব কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিজমি রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রতি বছর দেশে কৃষিজমি কমছে ৮২ হাজার হেক্টর, যা মোট জমির ১ শতাংশ। কৃষিশুমারি ১৯৮৪ ও ২০০৮-এর মধ্যে তুলনা থেকে দেখা যায়, চাষকৃত এলাকার পরিমাণ কমেছে সাত লাখ ৩৩ হাজার একর, অর্থাৎ ২৪ বছরে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষিজমি যেহারে কমছে তাকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞের মতে, প্রতি বছর দেশের জনসংখ্যায় যোগ হওয়া নতুন মুখের জন্য সাড়ে তিন লাখ টন বাড়তি চালের দরকার হয়। একদিকে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া এবং অন্যদিকে কৃষিজমি কমে যাওয়া রীতিমতো উদ্বেগজনক ব্যাপার। সীমিত আয়তনের বাংলাদেশে জমি খুবই মূল্যবান। ভবিষ্যতের কথা ভেবে, প্রতি ইঞ্চি জমি হিসাব করে ব্যবহার করতে হবে।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নগরায়ণের কারণে দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। আবাদি জমি কমে যাওয়ার কারণে বছরে ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন কম হচ্ছে। আবাদি জমি যেভাবে কমছে, তাতে দেশে আগামীতে খাদ্য নিরাপত্তা হমকির সম্মুখীন হবে। তাই সারা দেশে জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি জমির পরিকল্পিত ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা ও সচেতনতা দরকার। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে দেশে সংরক্ষিত কৃষিজমি ও বনভূমির পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। সে সঙ্গে নগরায়ণ ও উন্নয়ন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ এক সময় স্বপ্ন থাকলেও এখন তা বাস্তবতা। শুধুই তাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে হাইটেক পার্ক। এতে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে দেশ যেমন আরও এগিয়ে যাবে তেমনি বাড়বে কর্মসংস্থান। তবে এই পার্ক নিয়ে পরিবেশবিদরা চিন্তিত। তারা বলছেন, যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয় পার্ক নির্মাণের সময় সেটি দেখতে হবে। নানা কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে। আইটি বর্জ্য সারা পৃথিবীর পরিবেশের জন্যই এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকেও এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। কারণ যেহারে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে সে হারে বাড়বে প্রযি্ক্তু বর্জ্যও। এ বিষয়ে এখনই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে হবে। পরিবেশ সচেতনতার এ যুগে পরিবেশদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। এমনিতেই জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত হুমকির মুখে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে। এসব দিক বিবেচনায় পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক হতে হবে।
চার. প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণিকুলের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকতা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। লেখার মাধ্যমে তাদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবাদী সংগঠন নিয়ে বেশি করে খবর প্রকাশ করতে হবে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করতে হবে। পরিবেশসংক্রান্ত আইন-কানুন নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাও পরিবেশ সাংবাদিকতার অংশ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় আছে, আছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদের কার্যক্রম নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে পরিবেশ সাংবাদিকতার গতি-প্রকৃতি ও পরিধি বাড়াতে হবে এবং তা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট
drharun.press@gmail.com