অনেকেই ‘কন্যার বাপ’ ডাকছে

রবিউল ইসলাম জীবন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকবি। গান লিখছেন প্রায় দুই দশক ধরে। এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘জ্বীন-৩’ ও ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমায় আছে তার লেখা তিনটি গান। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন নাজমুস সাকিব রহমান

‘জ্বীন-৩’ সিনেমায় আপনার লেখা একটা গান আছে ‘কন্যা।’। এটা কীভাবে লেখা হলো?

ইমরান গানটির সুর করে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল। বলল, ‘ভাই, সময় কম। দ্রুত লিখে দেন।’ এরপর তার সঙ্গে গল্প নিয়ে কথা হয়। প্রথম অংশটা লিখেই তাকে কল করি। সুরের সঙ্গে মিলিয়ে সে গেয়ে শোনায়। দারুণ লাগছিল শুনতে। এরপর বাকি অংশ লেখা। এ গানের হুক হিসেবে যে দুটি লাইন আছে এটা লেখার পর ইমরানকে বলেছিলাম প্রথম লাইনটা রিপিট করতে। পরে শেষ পর্যন্ত দুটি লাইনই রাখা হয়। লেখার সময় গানটি নিয়ে আশাবাদী ছিলাম। তবে এত দ্রুত ছড়িয়ে যাবে, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে ভাবিনি। গানটির প্রতি ভালোবাসা থেকে অনেকেই এখন আমাকে ‘কন্যার বাপ’ ডাকছে। বাস্তব জীবনেও আমি এক কন্যার বাবা। সব মিলিয়ে সময়টা উপভোগই করছি। ‘কন্যা’র সাফল্যের কৃতিত্ব ইমরান-কনা-সজল-নুসরাত ফারিয়াসহ পুরো টিমের।

শাকিব খানের ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমায়ও তো আপনার লেখা গান দুটি আছে। একটি গেয়েছেন জুবিন নটিয়াল।

জুবিন নটিয়াল আমার কথায় ‘অন্তরাত্মা’র টাইটেলে কণ্ঠ দিয়েছেন। আমি নিজেও তার গায়কির ভক্ত। তার গান আমাকে একটা ঘোরে নিয়ে যায়। ফলে তার জন্য লিখতে পারাটা আনন্দের। এছাড়া এই সিনেমায় পিন্টু ঘোষ ও ন্যানসির কণ্ঠে ‘একা আড়ালে’ শিরোনামে একটি গান লিখেছি। দুটি গানেরই সংগীত পরিচালক কলকাতার ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। আমার ভীষণ প্রিয় এই দুটি গান। কিছু আক্ষেপও আছে।

একসময় অডিও গান বেশি লিখতেন। এখন কি ভিজুয়াল কাজ বেড়েছে?

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ক্যাসেটের গানে আমার অভিষেক। তখন একটা ক্যাসেট বা সিডিতে ১০-১২টা গান

থাকত। সময়ের পরিক্রমায় এখন সেটা নেই। শ্রোতারাও ভিজুয়ালসহ গান পেতে চায়। আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সিনেমা বা নাটকের গান যেহেতু গল্প থেকে আসে সেগুলোর ভিজুয়ালও সেভাবে হয়। কিন্তু মিউজিক ভিডিওর ক্ষেত্রে অনেক সময় হতাশ হতে হয়। অনেক সুন্দর সুন্দর গানের কথা অযৌক্তিক ভিজুয়ালের কারণে শ্রোতা-দর্শকের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করে।

আপনি ‘পরাণ’ সিনেমার ‘ধীরে ধীরে’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার পেলে কি লেখার মান বাড়ে?

পুরস্কার পেলে দায় তৈরি হতে পারে। লেখার মান বাড়ে না। সেই প্রচেষ্টা এবং ইচ্ছে নিজের ভেতর থেকেই আসতে হবে। মেধাও থাকা লাগবে। আরেকটা কথা-গান লেখার ক্ষেত্রে লেখার মান শুধু লেখকের ওপর নির্ভর করে না। আপনি যদি সিনেমা, নাটক বা কোনো প্রজেক্টের জন্য গান লেখেন সেক্ষেত্রে গানটি যারা চাচ্ছে তাদের ব্রিফ, প্রত্যাশা, এমনকি কী চিত্রকল্প আপনার ভেতর ঢুকাতে পারল সেটাও জরুরি। যিনি সুর বা প্রযোজনা করবেন তারও জানাশোনা বা ইচ্ছা থাকা লাগবে।

প্রায় এক হাজার গান লিখেছেন। নিজের লেখার সমালোচনা করুন।

এমন কয়েকটা গান লিখেছি যেগুলোর কথায় কোনো ম্যাজিক নেই। একজন চিন্তাশীল শ্রোতা সেখানে নতুন কিছু পাবেন না। অথবা লেখা ভালো হলেও সুর বা গায়কি যথাযথ হয়নি। কিন্তু দুইটা পয়সা পাব বলে লিখেছি। শিল্পী-সুরকারের তুলনায় আমাদের দেশে গীতিকারের সম্মানী সব সময়ই অনেক কম। আমার লেখা যত গান শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে সেগুলোর ঠিকঠাক রয়ালিটি পেলে গল্পটা অন্যরকম হতো।

তাহসান এবং মিনারের সঙ্গে আপনার গান আছে। ‘কেউ না জানুক’, ‘দেয়ালে দেয়ালে’। তাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

দুজনেরই ৭টা করে গান লিখেছি। তাদের গান লিখতে একটু বেশিই ভালো লাগে। যেহেতু দুজনই গান গাওয়ার পাশাপাশি চমৎকার লেখেন। সেই জায়গা থেকে তাদের কণ্ঠে আমার লেখা গান আছে, তাদের শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছাতে পেরেছি এটা সুন্দর অনুভূতি দেয়।

আইযুব বাচ্চু ও শাফিন আহমেদকে নিয়ে বলুন। দুজনের কেউ আমাদের মধ্যে নেই। আপনি তাদের জন্যও লিখেছেন।

বাচ্চু ভাইয়ের সুরে ২০১২ সালের ‘টেলিভিশন’ সিনেমার ‘গোলমাল’ গানটি লিখেছি। ২০১৪ সালে তিনি আমার কথায় পুরো একটি অ্যালবাম করার পরিকল্পনা করেন। কাজও শুরু হয়। মারা যাওয়ার আগে প্রায় ১০টি গানের সুর করেন। কয়েকটির মিউজিকও হয়। ‘নাগরিক সকাল’ এবং ‘কিছু মুহূর্ত’ নামে দুটি গান মাস্টার করা ছিল। ‘নাগরিক সকাল’ দেশ টিভি লাইভে এবং একটি অনুষ্ঠানেও করেছিলেন। উনার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। এই দুটি গান সামনে প্রকাশিত হবে। বাকি গানগুলো নিয়েও তারা ভবিষ্যতে কাজ করবেন।

অন্যদিকে শাফিন ভাইয়ের জন্য ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘মেঘের মেয়ে’ এবং ‘ভালোবাসা’ শিরোনামে দুটি গান লিখি। সবশেষ ‘ভালোবাসার জানালায়’ শিরোনামে একটি গান আসে। দুজনই আমাকে ভীষণ আদর করতেন, প্রশ্রয় দিতেন। শাফিন ভাইয়েরও জন্যও নতুন গান লেখার কথা ছিল। কিন্তু আর হলো কই!