সোশ্যাল পালস : তারেক রহমানের কাছে ‘গ্যাগ অর্ডার’ চেয়ে আবেদন

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি আলোচিত পোস্ট দিয়েছেন মো. জামিলুর রহিম, যিনি ‘স্কসিয়া জামিল’ নামে পরিচিত। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ট্যাগ করে দলের কিছু নেতানেত্রীর মুখ নির্বাচন পর্যন্ত ‘সিলগালা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার তালিকায় রয়েছেন বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা, যাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই আহ্বানটি অনেকেই সময়োপযোগী, সাহসী ও বাস্তবতাভিত্তিক বলেই দেখছেন। কারণ, এ ধরনের সরাসরি বার্তা অতীতে দেখা যায়নি। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হলেও, রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতাকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করাই সমীচীন। বিশেষ করে যখন একটি দল রাজনৈতিক সংকটে রয়েছে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে ব্যস্ত, তখন নেতাকর্মীদের বক্তব্য কতটা পরিমিত ও প্রাসঙ্গিক, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুঃখজনকভাবে, গত কয়েক বছরে বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এমন সব মন্তব্য করেছেন বা এমনভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি, বিরক্তি এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যখন দেশের মানুষ আধুনিক, সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক বার্তা শুনতে চায়, তখন কিছু নেতা পুরনো ধাঁচের বক্তব্যে আবদ্ধ থাকায় দলের প্রতি তরুণ সমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আস্থা দুর্বল হচ্ছে। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, যার ক্ষমতায় যাওয়ার পথ শুধুই নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আর সেই পথকে সুগম করতে হলে দলের বক্তব্য হতে হবে ঐক্যবদ্ধ, ভবিষ্যৎনির্ভর ও ইতিবাচক। বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও দলটি তা পুরোপুরি অস্বীকার না করে, বরং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বহু নেতাকে বহিষ্কার করে প্রমাণ করেছে তারা পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা।

এই পরিবর্তনের পেছনে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত সেই ঘটনাপ্রবাহ জনগণকে নতুনভাবে সাহসী করেছে, ফলে রাজনৈতিক দলগুলো নতুন প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে, বিএনপির কিছু নেতার বক্তব্য এখনো আত্মঘাতী প্রচারণার জন্ম দিচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেক সিনিয়র নেতা আছেন। এসব নেতা ৫ আগস্টের পর থেকে একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছেন। কখনো ছাত্রদের সঙ্গে কখনো জামাতের সঙ্গে। বিশেষ করে এনসিপি গঠিত হওয়ার আগে তারা বিভিন্ন টক-শোতে ছাত্রদের কটাক্ষ করে অনেক বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের হেয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলেছেন। এতে ক্ষতিটা হয়েছে বিএনপি নেতাদের। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা সুকৌশলে এই বিরোধ এড়িয়ে গেছেন। যার ফলে পুরো দায়টা গিয়ে পড়েছে বিএনপির ওপর।

একটা কথা উপলব্ধি করতে হবে যে, ছাত্রদের প্রতি সাধারণের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি কিন্তু এখনো আছে। এর কারণ অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি এবং প্রচলিত রাজনীতির বিপরীতে তাদের অবস্থান, যার স্বপ্ন দেখে এদেশের সাধারণ জনগণ। ছাত্রদের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে তারা রাজনীতিতে নতুন, তারা কোনোদিন ক্ষমতায় ছিল না। যে কারণে জনগণ তাদের ভুলকে সাধারণ ভুল মনে করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছে এবং ক্ষমতাসীন অবস্থায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বিএনপি ছাত্রদের সঙ্গে অযাচিত বিতর্কে জড়িয়ে নিজেরাই নিজেদের কৃতকর্মের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছেন। এটা দরকার ছিল না। এটা বিএনপি নিজে আমন্ত্রণ জানিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রদের বলতে বাধ্য করেছে যে, আমরাই সেই ছাত্র, যারা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেছি কিংবা যারা একটা বালুর ট্রাক সরাতে পারেনি তারা আজ বড় বড় কথা বলছে। বিএনপি এই ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেনি বরং মানুষের কাছে ট্রলের শিকার হয়েছে। যেখানে বিএনপিকে নিয়ে ইতিমধ্যে ‘ঈদের পর আন্দোলন’ নিয়ে একটা ট্রল চালু আছে সেখানে নতুন করে আরও কিছু বিতর্কে জড়ানো মোটেও উচিত হয়নি। এছাড়া বিএনপি দলের সূচনা, ৭ নভেম্বর পরবর্তী জিয়ার শাসন জননন্দিত হলেও বিএনপি সেই ইস্যুতে কিংস পার্টি, অনির্বাচিত সরকার ইত্যাদি বিষয়কে সামনে এনে নিজেরাই নিজেদের গর্তে ফেলেছেন। বরং বিএনপির উচিত ছিল এই ছাত্রদের অভিভাবকত্ব নেওয়া। তা না করে তারা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন, যা তাদের অবস্থানকে খাটো করেছে। এই নেতারা ‘বাপের আগে হেঁটো না’ বলে ভাবছেন, তারা বুঝি ছাত্রদের একহাত নিচ্ছেন। কিন্তু ঘটনা উল্টো হচ্ছে।

নেতাদের এইসব বক্তব্য বিএনপির সভায় বাহবা পাচ্ছে, ভাইরাল হচ্ছে ঠিকই, তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। লক্ষণীয় যে, এসব নেতার বক্তব্যের প্রধান সমালোচকরা নিজেরাই বিএনপির সমর্থক। তারা সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে নিজের দলের নেতাদের সমালোচনা করছেন। এ থেকেই স্পষ্ট যে, এই সমালোচকরা ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরোধী এবং তারা সৎভাবে রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে। তাদের কাছে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু তারা একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ চায়। অন্যদিকে, যেসব নেতাকর্মী তৃণমূল বা থানা পর্যায়ে পদ-পদবি ধারণ করছেন, তারা এই সমালোচকদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠিতভাবে কাজ করছেন, অনেকটা ‘বট বাহিনী’ রূপে। কিন্তু বড় নেতাদের পক্ষ নিয়ে তারা জনগণের সামনে নিজ অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারছেন না। বরং তাদের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব ও অযৌক্তিক অবস্থান সাধারণ ভোটারদের আরও বিরক্ত করছে। এতে সবচেয়ে বেশি হতাশ হচ্ছে বিএনপির আদর্শবান, নির্লোভ সমর্থকরা, যারা জুলাই অভ্যুত্থানে কিছুটা আশাবাদী হলেও এখন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। তবে সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই সরব সমালোচনাই প্রমাণ করে বিএনপির অনেক সাবেক ও বর্তমান কর্মী এখনো দলের প্রতি গভীর আনুগত্য পোষণ করেন। তারা শুধু চান চিন্তার আধুনিকতা, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ জবাবদিহি। তাদের দাবি ডিজিটাল গভর্নেন্স, যুবসমাজের অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। এটিই বিএনপির জন্য একটি বড় ইতিবাচক বার্তা দলের ‘মননশীল ভোট ব্যাংক’ এখনো সক্রিয়। তবে বিএনপির উচিত এই আত্মসমালোচনাকে ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবে বিবেচনা করা। দল যদি সাম্প্রতিক ইতিহাস তুলে ধরতে পারে যেভাবে গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন সহ্য করে বিএনপি টিকে থেকেছে তবে জনগণ সেই লড়াইকে মূল্যায়ন করবে। বিএনপিকে আন্দোলনের কৃতিত্ব কাড়ার চেষ্টার পরিবর্তে বরং জনগণকে বোঝানো উচিত যে, জুলাইয়ের অভ্যুত্থান বিএনপির ১৫ বছরের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা।

এই সময়ে যারা রাজনীতি করছেন, তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এখন আর আগের মতো একতরফা নিয়ন্ত্রণ নেই এই সময়টিতে ফ্যাসিস্টরাও একরকম কোণঠাসা। দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়া সাধারণ মানুষকে কথা বলার এক নতুন মঞ্চ দিয়েছে। মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা, মতামত, ক্ষোভ সবকিছু প্রকাশ করছে বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্যের মাধ্যমে। এবং এই কথাগুলো অনেক সময় এতটাই বাস্তব ও যুক্তিসংগত হয় যে অনেকেই সেই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। এতে সাধারণ মানুষ উৎসাহিত হচ্ছে তাদের অভ্যন্তরের সত্যকে উচ্চারণ করতে, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। এই প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা এবং সেখানকার অ্যাক্টিভিস্টদের উপেক্ষা করা বিএনপির জন্য মারাত্মক ভুল হবে। কারণ, এটাই এখন মানুষের সরাসরি মতপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। এমন ভুলের খেসারত ইতিমধ্যে অনেক বিএনপি নেতা দিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি ও সময়োপযোগী বার্তার অভাবের কারণে বিএনপি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

অবশ্যই, বিগত শাসনামলে বিএনপিরও কিছু ভুলভ্রান্তি ছিল যা কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন তারা বিতর্কে জড়ালে নিজেদের ভুল ভুলে গিয়ে শুধু অন্যদের দোষ তুলে ধরে নিজেদের তুলনামূলকভাবে ‘কম খারাপ’ প্রমাণ করতে চায়। এই অবস্থান রাজনৈতিক দৃষ্টিতে যেমন দুর্বল, তেমনি তা সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর মনে হয়। আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, বর্তমান সরকারের কোনো সদস্যের কোনো ইতিবাচক বা প্রশংসনীয় কর্মকা- সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে, বিএনপির সাইবার সমর্থকরা তাকে হেয় করার চেষ্টা করেন। তারা তখন নিজেদের দলে থাকা কিছু ‘গুণী’ মানুষদের তালিকা, ছবি, প্রোফাইল ইত্যাদি দিয়ে ফেসবুক, টুইটার বা অন্যান্য মাধ্যমে পাল্টা প্রচারণায় নামেন। বিষয়টা অনেকটা ছোটবেলার সেই গল্পের মতো : উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘রাজা ও টুনটুনি’ গল্পে যেমন বলা হয়, ‘রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে।’ যদিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এই গল্পের মূল বক্তব্যের সরাসরি মিল নেই, তবুও বিএনপির আচরণটা গল্পের টুনির মতোই শোনায় আত্মবিশ্বাসহীন ও প্রতিযোগিতার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল। আন্দোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া, কিন্তু অভ্যুত্থান হঠাৎ আসে। সুতরাং বিএনপিকে এই মুহূর্তে দায়িত্বশীল বক্তব্য, ঐক্যবদ্ধ কৌশল ও স্পষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যদি সত্যিই নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে চায়, তবে এখনই প্রয়োজন একটি স্পষ্ট বার্তা দল দায়িত্ব নিতে চায়, দলের বক্তব্য হবে একমুখী, তথ্যনির্ভর এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। এই পরিপ্রেক্ষিতে কিছু নেতার বক্তব্যের ওপর সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আরোপকে ‘গ্যাগ অর্ডার’ না বলে ‘বার্তা শৃঙ্খলা’ বা message discipline বলাটাই শ্রেয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ অনেক দেশেই নির্বাচনের আগে দলীয় বক্তব্য নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত নীতি গ্রহণ করা হয়। কারণ, যত সুনির্দিষ্ট, ঐক্যবদ্ধ ও ইতিবাচক বার্তা দেয়া যায়, দলের গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়ে। এই ‘বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ কৌশল’ দলের জনপ্রিয়তা, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী সাফল্য তিনটি ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন প্রজন্ম এখন নেতিবাচক রাজনীতি নয়, বরং ভবিষ্যৎনির্ভর সমাধান চায়। তাই দায়িত্বশীল বক্তব্য ও পরিকল্পিত বার্তা প্রদানের সময় এখনই। বিএনপির সামনে রয়েছে একটি বড় সুযোগ নিজেকে জনগণের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি এই পরিবর্তনের ধারাকে কতটা আত্মস্থ করতে পারে।

লেখক: চিকিৎসক ও সাংবাদিক

sajolashfaq@gmail.com