দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি কাতার এনার্জি এলএনজির কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাবদ সব বকেয়া বুধবারের মধ্যে পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যখন দেশটিতে চার দিনের সফরে অবস্থান করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
মূলত কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরও উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহের জন্যই বকেয়া পরিশোধের এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি এলএনজি এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধ না করায় গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৭ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নানা উদ্যোগের ফলে সেই বকেয়া কমে গত ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৭ দশমিক ৬২ মিলিয়নে দাঁড়ায়। এর মধ্যে কাতার এনার্জির বকেয়া ৩৭ মিলিয়ন ডলার এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিংয়ের কাছে বাকি ৩০ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাতার এনার্জির ৩৭ মিলিয়ন ডলার পাওনার মধ্যে আজ (গতকাল) ৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ৩২ মিলিয়ন ডলার আগামীকাল (আজ) পরিশোধ করা হবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে ডলার ছাড় করায় আট মাসে বকেয়া পরিশোধের হার অনেক বেড়েছে। এ মাসের মধ্যে এলএনজি আমদানি বাবদ সব বকেয়া বিল পরিশোধ করার চেষ্টা চলছে।
জিটুজি (সরকারিপর্যায়ে) ভিত্তিতে কাতার এনার্জির কাছ থেকে বছরে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্যাসের বকেয়া বিল চেয়ে এ বছরের গোড়ার দিকে চিঠি দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
‘আর্থনা সামিট-২০২৫’-এ অংশ নিতে চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার কাতারের রাজধানী দোহার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানসহ অন্যরা তার সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন।
সফরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরও উন্নয়ন হবে বলে আশা করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। পাশাপাশি বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে দুদেশের মধ্যে আলোচনার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘গ্যাসের ক্ষেত্রে কাতার বিশে^র পাওয়ার হাউজ। তাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে। এলএনজি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ হবে। আমরা চাই তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের আরও উন্নতি হোক। যাতে তাদের থেকে বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ আনতে পারি।’
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্বের স্পট মার্কেটে দাম ওঠানামার কারণে জিটুজি (সরকারিপর্যায়ে) ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি বাড়াতে পরিকল্পনা ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়ানোর আলোচনা শুরু করেছে সরকার।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের ভেতরে বিদেশি তেল-গ্যাস উত্তোলন কোম্পানি (আইওসি), কাতার এনার্জি ও স্পট মার্কেটের এলএনজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া বাবদ ৭৫ থেকে ৮০ কোটি ডলার পাওনা ছিল। এ কারণে কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করলেও ভালো ও গ্রহণযোগ্য কোনো কোম্পানি এলএনজি আমদানির দরপত্রে অংশ নেয়নি। এমনকি বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণে নিয়মিত এলএনজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোও এখন আর দরপত্রে অংশ নিচ্ছে না। তা ছাড়া বকেয়া না পাওয়ার কারণে মাঝে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল কাতার এনার্জি।
তবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বৈদেশিক বকেয়ার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বৈদেশিক দেনা ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এখন তা ৮২৯ মিলিয়ন (৮২ কোটি ৯০ লাখ) ডলারে নেমে এসেছে। এ বছরের মধ্যে এসব দেনা পরিশোধের পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বকেয়া রেখে আমাদের ইজ্জত বাড়বে না। তা ছাড়া জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এটি বাধাগ্রস্ত করবে। আরও আগেই কাতার এনার্জির বকেয়া পরিশোধ করার দরকার ছিল। বকেয়া পরিশোধের এই উদ্যোগ ভালো।’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে আরও জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কাতার এনার্জি এবং ২০১৮ সালের ৬ মে ওমানের ওকিউটির সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানির চুক্তি করে। কাতার এনার্জির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর এবং ওকিউটির সঙ্গে ১০ বছর। কাতারের প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বছরে ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন এবং ওমানের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বছরে এক- দেড় মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমেও এলএনজি আমদানি শুরু হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত কাতার এনার্জি থেকে ২৪০ কার্গো এবং ওকিউটির কাছ থেকে ১১৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে ৬৯ কার্গো এলএনজি। সব মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ৪২৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
এলএনজি আমদানির বিপরীতে প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আমদানির ব্যয় পরিশোধে বড় ধরনের চাপে পড়তে হয়েছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে এলএনজি কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।
জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে বিশ্বব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৭০ কোটি ডলারের ঋণ সুবিধা নিতে বহুজাতিক এ দাতা সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
গ্যাস খাতের নিরাপত্তা সুবিধা নামে এ ঋণ মিলবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে ৩৫ কোটি ডলার দিতে চায় বহুজাতিক দাতা সংস্থাটি। এর মধ্যে নন-ফান্ডেড ঋণ সুবিধার আওতায় ২০ কোটি ডলার দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে এবং ৫ কোটি ডলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য দেওয়া হবে। তা ছাড়া ফান্ডেড সুবিধার আওতায় চলতি মূলধন হিসেবে দেওয়া হবে ১০ কোটি ডলার।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, এ ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলে বছরে ২ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। এর মধ্যে এলএনজি আমদানিতেই সাশ্রয় হবে দেড় কোটি ডলার। তা ছাড়া এর মাধ্যমে বছরে বাড়তি দশমিক ৪৯ মিলিয়ন টন গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৪ শতাংশের মতো কমবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৯০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে কাতার ও ওমান থেকে ৫৬ কার্গো এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩৪ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাতার থেকে ২৭ কার্গো, ওমান থেকে ১০ কার্গো এবং স্পট মার্কেট থেকে ২২ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এ বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত স্পট মার্কেটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য থেকে চার কার্গো ও সিঙ্গাপুর থেকে দুই কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।