কর ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি

একটা দেশ মূলত চলে করের টাকায়। দেশের জনগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর দেয়, তা দিয়েই সরকার উন্নয়ন ও দেশ পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় বহন করে। স্বাভাবিকভাবেই কর আহরণের পরিমাণ যত বেশি হবে, সরকারের পক্ষে উন্নয়ন কার্যক্রম তত বেগবান করা সম্ভব। আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যত বেশি হবে, ততই কমবে বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য। বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ কর মোট করের শতকরা ৩০ ভাগ। বাকি ৭০ ভাগ হচ্ছে, পরোক্ষ কর। এই পরোক্ষ করের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। 

কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা, কমবেশি সব দেশেই রয়েছে। তবে পাশ্চাত্যে কর ফাঁকি দেওয়া সহজ নয় কর আদায় পদ্ধতির কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে যাদের কর প্রদানের সামর্থ্য রয়েছে, তারাই কর ফাঁকি দিতে সিদ্ধহস্ত বলে প্রচার রয়েছে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকি রোধ করার গতি স্তিমিত প্রায়। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদ্যাবধি টেকসই কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ৪ বছর আগে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকি রোধে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতায় তা ভাটা পড়ে। ফলে প্রকৃত আয়কর আদায় করা প্রায় অসম্ভব। এই ব্যর্থতা একান্তই এনবিআরের নাকি অন্য কারও? মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, রিটার্ন দেয় না নিবন্ধিত ৯১ শতাংশ কোম্পানি। এই দায় কার? বাংলাদেশের কর কাঠামোতে নানা ধরনের জটিলতা বিদ্যমান। বিশেষ করে নানা ক্ষেত্রে যেমন অব্যাহতি দেওয়া আছে, তেমনি অনেক কোম্পানি ঠিকমতো কর পরিশোধ করে না। আর নিবন্ধিত যত কোম্পানি আছে, তার মধ্যে ৯১ শতাংশই রিটার্ন দাখিল করে না। রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার জন্য আইন সংস্কার করতে হবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যারা রিটার্ন দাখিল থেকে বিরত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার উদ্যোগ নিতে হবে। করপোরেট করের বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এসব কথা জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংগঠনটির ধানম-ির কার্যালয়ে গত সোমবার ‘কর ন্যায্যতার দৃষ্টিতে উত্তরণকালীন সময়ে করপোরেট করের সংস্কার’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলা হয়েছে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তামিম আহমেদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের অধীনে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ২ লাখ ৮৮ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ২৪ হাজার ৩৮১টি কোম্পানি রিটার্ন দাখিল করে, যা মোট নিবন্ধিত কোম্পানির মাত্র ৯ শতাংশ। এটি করপোরেট কর আহরণের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। অনেক কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে রিটার্ন দাখিল করে না।

যেসব কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে রিটার্ন দাখিল করছে না তাদের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এজন্য বিদ্যমান কর আইনে সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে ১২ শতাংশ করপোরেট কর রয়েছে। এই কর ন্যূনপক্ষে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত বলে মনে করে সিপিডি। বাংলাদেশে করপোরেট, ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কর ফাঁকি ও কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। আর্থিক অঙ্কে যার পরিমাণ ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যেটি এনবিআরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সমান। প্রত্যক্ষ কর না দিলেও বিপুল জনগোষ্ঠী পরোক্ষ কর দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এই কর কি সরকার পাচ্ছে ঠিকমতো? ছোট, মাঝারি ও বড় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই কমবেশি কর ফাঁকির সুযোগ নিচ্ছে। সেখান থেকে কীভাবে বের হয়ে আসা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কর ব্যবস্থার সংস্কার এমনভাবে করা উচিত, যাতে কোম্পানিগুলো রিটার্ন দিতে বাধ্য হয়। শাস্তির ভয় থাকলে, প্রশাসনে সৎ মানুষের নেতৃত্ব থাকলে, করের করুণ দশা থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব।