টার্গেট এবার পোলট্রি খাত

অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রাণিসম্পদ খাত। দীর্ঘ সময় ধরে যার উপখাত হিসেবে পোলট্রিশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টির অন্যতম উৎস ডিম। এই ডিম এবং মাংস সরবরাহের মাধ্যমে দেশের প্রোটিন ঘাটতি পূরণে পোলট্রি খাতের পরিচিতি পুষ্টি বিজ্ঞানীদের কাছেও অনেক। এতদিনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খাতকে বৃহত্তম বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করার কথা ছিল। কারণ দেশে বাণিজ্যিকভাবে ব্রয়লার, লেয়ার শিল্পের যাত্রা শুরু হয় আশির দশকে, যা পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে গতিশীলতা লাভ করে। 

বাংলাদেশে পোলট্রিশিল্প অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। প্রায় ৬০ লাখ যুবক ও নারী এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এ সেক্টরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের শতভাগ যদিও সাধারণ মানুষের নয়। এখানে রয়েছে করপোরেট ব্যবসায়ী দল, যাদের আমরা বলি ‘সিন্ডিকেট’। হঠাৎ করে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে তা বাস্তবায়ন না হলে, আগামী ১ মে থেকে সারা দেশে ডিম ও উৎপাদনকারী সব খামার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)। সংগঠনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদারের মতে, গত দুই মাসে সারা দেশের খামারিরা ‘আনুমানিক’ ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছে ডিম-মুরগি বিক্রিতে। অথচ কয়েক মাস ধরেই বাজারে ডিম-মুরগির দামে স্থিতিশীলতা রয়েছে। ভোক্তারাও রয়েছেন স্বস্তিতে। গত দুই মাসে দেশের খামারিরা ‘আনুমানিক’ ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছে তার ভিত্তি কী? সংগঠনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, “আমি ‘গবেষণা’ করে খামারিদের লোকসানের এই তথ্য বের করেছি।” যদিও তার কোনো গবেষণা টিম নেই বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেন। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গত ২১ তারিখ বিপিএর সভাপতিসহ ৮-৯ জন সদস্যের সঙ্গে মিটিং করেন। সেখানে তাদের দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে, সেদিনই খামার বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয় বিপিএ।

বিভিন্ন সময় ডিম-মুরগির বাজার অস্থিরতার কারণে ভুগেছেন ভোক্তারা। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশের ডিম-মুরগির বাজার অস্থির ছিল। তৎকালীন সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও তাদেরই আশকারায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়নি। করপোরেট গ্রুপগুলোর তৈরি করা কৃত্রিম সংকটে মুরগির বাচ্চা ক্রয় করতে না পেরে উৎপাদন থেকে বাধ্য হয়ে সরে যাচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা। বাজারের বেশিরভাগ মুরগি এখন করপোরেট গ্রুপগুলোর। বাজার তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের ইচ্ছামতো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। পোলট্রি খাতের পরিচিত সংগঠনগুলোর একটি ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন। এর সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিপিএর কাজকর্ম এবং কথাবার্তা পুরোপুরি উদ্ভট। এ ধরনের চরিত্র শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। তার বিষয়ে সরকারের অনুসন্ধান করা উচিত। কারণ এ শিল্পে দেশি-বিদেশি ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। 

বর্তমানে পোলট্রি খাতে এক লাখের মতো ছোট-বড় খামার রয়েছে। যেখানে সরাসরি ২৫ লাখ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করছে। প্রতিদিন পোলট্রি খাত থেকে ৪-৪.৫ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হয়। পোলট্রি খাতটি শুধু ডিম-মুরগির উৎপাদন নয় বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি মিলিয়েই। এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। আমিষের চাহিদা পূরণে বৈজ্ঞানিক উপায়ে অধিক হারে মুরগি, হাঁস উৎপাদনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের জন্য এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। বর্তমানে, মাংস উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উৎস হলো পোলট্রি। এখন এই খাতের দিকে শকুনের দৃষ্টি পড়েছে। সাধারণ মানুষ উচ্ছন্নে যাক। এই মানসিকতা আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দলীয় রাজনীতির ইন্ধন। তাহলে কি নেপথ্যে কোনো শক্তি কাজ করছে? শুধু পোলট্রি নয়, যেকোনো ভোগ্যপণ্যে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। সরকার কি অশুভ শক্তির কাছে সত্যিই অসহায়!