রানা প্লাজা ধসের এক যুগ

হতাহতদের পরিবারের পুনর্বাসন হয়নি, হয়নি সুচিকিৎসা

আজ ২৪ এপ্রিল। এক যুগ আগে এই দিনেই ঘটেছিল দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ এক শিল্প দুর্ঘটনা—রানা প্লাজা ভবন ধস। প্রাণ হারিয়েছিলেন শতাধিক শ্রমিক, নিখোঁজ হন অনেকেই, আর যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের অনেকে হারান হাত-পা। গাইবান্ধার সেইসব হতাহত পরিবারগুলোর জীবন আজও থমকে আছে ২০১৩ সালের সীমানাতেই। পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। সরকারি সহায়তা থেমে গেছে বহু আগেই।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় গাইবান্ধার ৪৯ জন নারীসহ প্রাণ হারান। নিখোঁজ হন ১১ জন এবং আহত হন শতাধিক। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তিন দফায় নিহতদের পরিবারকে মাত্র ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর আর কোনো আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

সাদুল্লাপুরের সোনিয়া বেগম, যিনি রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন। তিনি জানান, ভবনের সপ্তম তলায় আটকে ছিলেন তিনি। বের হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বিধ্বস্ত পিলারের নিচে চাপা পড়ে যায় তাঁর ডান পা। তিনদিন পর উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে কোমরের নিচ থেকে পা কেটে ফেলতে হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর সাংবাদিকরা আসে, ছবি তোলে, কথা বলে, খবর করে—কিন্তু আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। সরকার আর কিছু দেয়নি।’

সোনিয়ার স্বামী মিজানুর রহমান জানান, ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। এখন একটি ছোট দোকান দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। ১০ বছরের মেয়ে মিম্মি ও স্ত্রীকে নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন তারা।  

আরেক ভুক্তভোগী রিকতা খাতুন, যিনি চকগোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা, ভবন ধসে ডান হাত হারিয়েছেন। চারদিন ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার পর করাত দিয়ে হাত কেটে তাকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে ১২ লাখ টাকার একটি সঞ্চয়পত্রের মাসিক সুদেই চলে তাঁর সংসার। তিনি জানান, সরকার চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু আজও পাইনি।

নিহতদের পরিবারগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কিশামত হলদিয়া গ্রামের স্মৃতি রাণীর পরিবারের দাবি, মৃত্যুর পর একবার ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পেয়েছেন, এরপর আর কোনো সহায়তা আসেনি। দক্ষিণ ভাঙ্গামোড় গ্রামের সবুজ মিয়ার পরিবার ছেলের হাড়গোড় ফিরে পেয়েছিল মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে, ষোলদিন পর।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল জানান, দুর্ঘটনার পরপরই এককালীন সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এরপর পুনর্বাসনের জন্য আর কোনো সরকারি নির্দেশনা আসেনি।

১২ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অনেকের শরীরে রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষের ক্ষত, জীবনে বয়ে চলেছে সেই ধসের ভার। প্রতিবছর দিনটি এলেই তাঁদের মনে পড়ে রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো, যা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দিন কাটছে আজও।