নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা শাহ আবজাল খান তপুকে স্মাতক পাস করাতে অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে তথ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধীনে নোবিপ্রবি তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা (আইএসএলএম) বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ৬০ শতাংশ উপস্থিতির শর্ত পূরণ না হওয়ায় ছাত্রলীগ নেতার জন্য বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের আইএসএলএম বিভাগের শিক্ষার্থী এবং নোবিপ্রবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি শাহ আবজাল খান তপুর ৮ম সেমিস্টারে উপস্থিতির হার ৬০ শতাংশের নিচে ছিল। যার ফলে তিনি নিয়মিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে তার জন্য বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। উপস্থিতির হার পূরণ করতে বিভাগের শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে অনলাইনে ক্লাস নিয়ে তার শর্ত পূরণ করে। এতে নতুন প্রশ্ন তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষা সম্পর্কিত সকল কিছু তার জন্য আলাদা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া ছাত্রলীগ নেতার জন্য বিভাগ থেকে পরীক্ষা পত্রের মডারেশন ফিও মওকুফ করার অভিযোগ উঠেছে।
নোবিপ্রবি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের তথ্য মতে, ১৬ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত শাহ আবজাল খান তপু স্নাতক ৪র্থ বর্ষের ২য় সেমিস্টারের সকল বিষয়ে অংশগ্রহণ করেন। যেখানে মোট ৫টি বিষয়ের পরীক্ষায় তিনি একক অংশগ্রহণ করেন। এর আগে ১২ মার্চ এই বিশেষ পরীক্ষার ব্যয়বাবদ প্রশ্ন মডারেশন ফি ব্যতীত ২৩ হাজার ১০ টাকা অগ্রণী ব্যাংকের নোবিপ্রবির হিসেবে জমার দেওয়ার নির্দেশ দেয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। পরবর্তীতে পরীক্ষার ফি জমা দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কথা জানান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, রিজেন্ট বোর্ডের ৬ষ্ঠ সভায় অনুমোদিত "নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অধ্যাদেশ"র ১০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্লাসে ৬০ শতাংশ উপস্থিতি না হলে কোনও শিক্ষার্থী সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে না। এ ছাড়া কেউ যদি ৬০-৬৯ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত থাকে তাহলে তাকে এক হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা অধ্যাদেশের ৯(৪)(C) অনুচ্ছেদে স্পেশাল পরীক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে কোনো শিক্ষার্থী যদি স্নাতক শেষ করার পর কোনও ব্যাকলগ থাকে তাহলে তা ৪র্থ বর্ষের ২য় সেমিস্টার পর দিতে পারবে। তবে সর্বোচ্চ ৩টি কোর্স বা ১৫ ক্রেডিটের বেশি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। পাশাপাশি তাকে অবশ্যই রেগুলার পরীক্ষার বসার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো আইন অথবা অধ্যাদেশে বিশেষ অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার নিয়মের বিষয়ে উল্লেখ নেই।
বিশেষ বিবেচনায় পরীক্ষা দেওয়া নোবিপ্রবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি শাহ আবজাল খান তপু বলেন, আমি অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারিনি। পরে বিভাগীয় ডিরেক্টরের অনুমতিতে ২৩ হাজার ১০ টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষার সুযোগ পাই। তবে দুইটি কোর্সে উপস্থিতি কম থাকায় সেগুলোতে বসতে দেওয়া হয়নি। তখন ৪৫% উপস্থিতি ছিল, পরবর্তীতে অনলাইনে ক্লাস করে ৬০% পূরণ করি। এরপর নিয়ম অনুযায়ী ১,০০০ টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি।
এ বিষয়ে শিক্ষা বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, শাহ আবজাল খান তপু স্নাতকের সর্বশেষ সেমিস্টারে নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করতে পারায় আমরা তাকে নিয়মিত পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেইনি। পরবর্তীতে বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং নোবিপ্রবিসহ সেন্ট্রাল সমন্বয়করা জানান তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিশেষ অনুমতি নিয়ে তপুর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের তার বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকায় মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে ইনস্টিটিউট পরিচালক জানান, যেহেতু তার এটেন্ডেন্স কম ছিল, তাই শর্ত পূরণের জন্য ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা অনলাইনে ক্লাস নিয়ে তার এটেন্ডেন্স শর্ত পূরণ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরীক্ষা উপ নিয়ন্ত্রক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে আইএসএলএম বিভাগের এই শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কেউ আবেদন করলে আমাদের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট তা পেশ করা। কর্তৃপক্ষ যদি অনুমতি দেয় তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।
বিশেষ নিয়মে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়ে এই উপ-নিয়ন্ত্রক বলেন, শিক্ষা অধ্যাদেশে বিশেষ অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার আইন নেই। তবে পরীক্ষার খরচ বহন করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল বিধায় তার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
নোবিপ্রবি উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, প্রথমে ৬০ শতাংশ উপস্থিতি না থাকায় পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি এই শিক্ষার্থীকে। সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট ভালো বলতে পারবে কেন তারা তার জন্য পরবর্তীতে আলাদা পরীক্ষা নিয়েছে। আমার কাছে পারমিশনের জন্য এখনও আসেনি। আমি এ বিষয়টি জেনে খতিয়ে দেখব।