মিয়ানমারে ট্রলারভর্তি নির্মাণসামগ্রী পাচার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর সেখানে বাংলাদেশ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষিপণ্য ও নির্মাণসামগ্রী পাচারের মহোৎসব চলছে। এবার কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতিপত্র জালিয়াতি করে মিয়ানমারে ট্রলারভর্তি নির্মাণসামগ্রী পাচারের প্রমাণ মিলেছে।

বুধবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে নেওয়ার পথে এসব মালামাল পাচার করে দেয় একটি সিন্ডিকেট।

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় যেখানে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। তবে জরুরি প্রয়োজনে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইউএনওর অনুমতিপত্র সংগ্রহের আইনগত বিধি রয়েছে।

সম্প্রতি টেকনাফের ইউএনও সেন্টমার্টিনে যান। সেখানের পর্যটন তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রটি ভেঙে গেলে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ টিআর প্রকল্পের অধীনে মেরামতের জন্য বরাদ্দ প্রদান করেন। ওই বরাদ্দের অনুকূলে ইউএনও কেন্দ্রের ইনচার্জ আসেকুর রহমানকে কিছু নির্মাণসামগ্রী সেন্টমার্টিনে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।

সেই অনুমতিপত্র জালিয়াতি করে বুধবার টেকনাফের কেরুণতলী ঘাট থেকে মো. আলম নামে সেন্টমার্টিনের এক বাসিন্দার ট্রলারে অতিরিক্ত নির্মাণসামগ্রী বোঝাই করা হয়। পরবর্তীতে সেই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ইউএনও কার্যালয় থেকে পাওয়া স্মারকটি সব নম্বর ঠিক রেখে থেকে দুইটি অংক পরিবর্তন করা হয়েছে। যেখানে ৮১৭ স্থলে রয়েছে ৮১৬। আর সিমেন্ট ২০ ব্যাগের স্থানে ৪০০ ব্যাগ লেখা হয়েছে।

সেন্টমার্টিন ঘাটের সার্ভিস বোটের লাইনম্যান করিম উল্লাহ বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের মো. আলমের মালিকাধীন সার্ভিস ট্রলারটি যাত্রী নিয়ে দ্বীপ ঘাট থেকে টেকনাফ যায় ২৮ এপ্রিল বিকালে। স্বাভাবিকভাবে ট্রলারটি ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে দ্বীপে পৌঁছার কথা। কিন্তু ১ মে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রলারটি ঘাটে পৌঁছেনি। খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়— ট্রলারটি মিয়ানমারের আরাকান আর্মির কাছে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন অনুমতিপত্র জালিয়াতি এবং মিয়ানমারে এসব পণ্য পাচারের তথ্য স্বীকার করে বলেন, ‘ইতিমধ্যে কার্যালয় থেকে দেওয়া অনুমতিপত্র এবং ট্রলারে মালামাল বোঝাইকালে প্রদর্শিত অনুমতিপত্র মিলিয়ে দেখেছি। এতে জালিয়াতির বিষয়টি পরিষ্কার। একইসঙ্গে পণ্যবোঝাই ট্রলারটি দ্বীপে না নিয়ে মিয়ানমারে পাচারের বিষয়টিও অবহিত হয়েছি। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

এদিকে পাচারের নেপথ্যে অনুসন্ধানে মিলেছে ৭ জনের সিন্ডিকেটের একটি চক্রের নাম। যে চক্রটি দীর্ঘদিন নানা জালিয়াতির মাধ্যমে মিয়ানমারের খাদ্য পণ্য, কৃষি পণ্য সার, নির্মাণসামগ্রী পাচার করে আসছে।

যেখানে উঠে এসেছে ট্রলার মালিক মো. আলম, সেন্টমার্টিন ঘাটের স্পিডবোটের লাইনম্যান জাহাঙ্গীর আলম, নারী ইউপি সদস্য মাহফুজা আক্তার, জেলা প্রশাসনের কর্মচারী আসেকুর রহমান, সেন্টমার্টির ইউপি সদস্য আকতার কামাল, ট্রলার মাঝি নুরুল ইসলাম, টেকনাফের কেফায়েত উল্লাহর নাম। যে সিন্ডিকেটটি গত ১২ নভেম্বর একই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে আরও দুইটি ট্রলারে নির্মাণসামগ্রী পাচার করে আসছিল।

এ বিষয়ে নারী ইউপি সদস্য মাহফুজা আক্তার প্রতিবেদককে বলেন, ‘এসবের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। পর্যটন তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রটির সভাপতি তিনি। এই কেন্দ্রের বিপরীতে নির্মাণসামগ্রী দ্বীপে আনার অনুমতি পান কর্মচারী আসেকুর রহমান। বিষয়টি জানার পর তিনি নিজেও খোঁজখবর নিয়েছেন।’

এ ধরনের জালিয়াতি এবং পাচারে জেলা প্রশাসনের কর্মচারী জড়িত থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর বলে মন্তব্য করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’