গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন

প্রতি বছর ৩ মে বিশ্ব জুড়ে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ বা মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশেও সাংবাদিক সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থা এ উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘৩ মে বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদপত্রই প্রথম সৃষ্টি করেছে সভ্যতার উন্নয়নের উত্তাল ঢেউ। বাংলাদেশ বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির দেশ হিসেবে এগিয়ে চলছে। শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। সংবাদপত্রেও বাদ নেই। গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। চারপাশের নানা ঘটনার মধ্যে জরুরি এবং ব্যতিক্রম, যা সাধারণের জানার আগ্রহ আছে, জানার প্রয়োজন আছে তা গণমাধ্যমে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। একটি সংবাদ একজনের প্রয়োজন মেটায়, একটি সমাজের অসংগতি দূর করে এবং ইতিহাস ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে।

পাকিস্তান আমলে আমাদের গণমাধ্যম ছিল হাতেগোনা। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না বলে সাংবাদিকদের অনেক কৌশলে সংবাদ পরিবেশন করতে হয়েছে। কিন্তু এখন লেজুড়বৃত্তিক সাংবাদিকতা শুরু করেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। ফলে সাংবাদিকতার মান ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। গত দুই দশকে সাংবাদিকতার নামে রাজনৈতিক চাটুকারিতা, সুবিধাবাদী আচরণ এবং গণমাধ্যমের অংশবিশেষের পক্ষপাতিত্বপূর্ণ ভূমিকা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিকে বিপন্ন করেছে। প্লট, ফ্ল্যাট কিংবা আরও কিছু ব্যক্তিগত প্রাপ্তির লোভে সাংবাদিকতার নীতি বিসর্জন দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকতার গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে। কিন্তু সাংবাদিকদের হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তাদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল আইনের চোখে নয়, বাস্তব চর্চায়ও নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার সঠিক তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনই সাংবাদিকদেরও নিজেদের পেশাগত নৈতিকতা এবং দায়িত্বের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। অতীতে সাংবাদিকতার নামে চাটুকারিতা কিংবা পক্ষপাতিত্বের যে উদাহরণ দেখা গেছে, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম গড়ে তুলতে হলে সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব

গণমাধ্যম ও সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। গণমাধ্যমের বিকাশ ঘটেছে সমাজকে আশ্রয় করে। গণমাধ্যম সর্বপ্রথম মানুষের তথ্যের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করেছে। এটা মানুষের কৌতূহল নিবৃত্ত করে যাচ্ছে। সমাজের প্রতি গণমাধ্যমের যে দায় এবং যে দায়িত্ববোধ, সেটা সত্যিকারার্থে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে। সমাজ এবং সামাজিক ব্যবস্থাকে সঠিক পথে এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সবসময় অসামান্য অবদান রেখেছে। বিচ্যুতিও আছে। তবে সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের ভূমিকা সব সময় প্রশংসনীয়।

বিশ্বব্যাপী প্রেস ফ্রিডমের অবস্থা

ইউনেস্কোর রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪৫৫ জন সাংবাদিককে তাদের কাজের কারণে খুন হতে হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সর্বাধিক সাংবাদিক খুনের ঘটনা ঘটেছে মেক্সিকোতে। ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৮টি দেশে অন্তত ১২৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সাংবাদিকতার জন্য যে দেশগুলোকে ‘খারাপ’-এর তালিকায় ফেলা হয়, তার মধ্যে রয়েছে আমাদের দেশ। ব্রাজিল, রাশিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোও এই তালিকায়। ‘গণতন্ত্র, বৈষম্যহীন সমাজ, আইনের শাসন ও সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে গণমাধ্যম সংস্কারের এখনই সময়। শিকড় থেকে বিকশিত সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীল অধিকার বোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে আদান-প্রদান প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি এবং সেটি ধরে রাখতে পারাই গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব। সেটি অর্জন করতে অবশ্যই গণমাধ্যকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী হতে হবে।

গণমাধ্যমকে তার মূল দর্শনে ফেরাতে না পারলে, কাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। আমরা সবাই জানি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর প্রসারে সাংবাদিকতার পরিধি আজ ব্যাপক ও বিস্ময়করভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বলতেই হবে, অধুনা সাংবাদিকতার বেশ কিছু সংকট বা সীমাবদ্ধতা আছে, যা হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নানাবিধ কৌশলী আইনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার সহায়ক নয়। জানা এবং মানা দুটিই প্রয়োজন যে, সাংবাদিকতা পেশা সংবাদকর্মীদের জন্য কেবল চাকরি নয়, কিংবা সংবাদশিল্পের মালিকদের জন্য কেবল ব্যবসা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এর অন্যথা ঘটে বলেই সাংবাদিকতা তার মর্যাদা হারায়। মূলত, সংবাদ প্রকাশ এবং প্রচার, সামাজের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধ সেবা। বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে সাংবাদিকতার মান আরও বাড়বে। সত্যিকার অর্থে যদি বিভিন্ন সংকট দূর করার চেষ্টা করা হয়। আমাদের দেশে সাংবাদিকের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও জীবনদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানালেই এই দিবসটি যথার্থ মহিমান্বিত হবে। না হলে, মুক্ত গণমাধ্যমের বিষয়টি কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে। আমরা যেন সেই পথে না হাঁটি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের স্বার্থেই গণমাধ্যমকে নিজস্ব পথে চলতে দিতে হবে। অবশ্যই গণমাধ্যম দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। আমরা যেন গণমাধ্যমকে শত্রু না ভেবে, বন্ধু হিসেবে কাছে রেখে দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যাই।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

drmazed96@gmail.com