আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয়

গত আট মাসে বাংলাদেশের একশর বেশি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। সংখ্যায় কম হলেও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধ হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত এই কারখানাগুলোতে কাজ করতেন লক্ষাধিক কর্মী। তারা সবাই বেকার হয়ে গেছেন। একে তো দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, তার ওপর জীবিকা হারিয়ে আয়শূন্য হয়ে যাওয়া এই বিপুল জনগোষ্ঠী কীভাবে জীবনধারণ করবে? পেটের খিদে আইন মানে না, হিতাহিত জ্ঞান তো দূরের কথা। দুধের শিশু যখন খিদেয় কাঁদে, বৃদ্ধা মায়ের চিকিৎসার অভাবে আহাজারি যখন মর্মমূলে আঘাত করে, তখন পৃথিবীর আর সব চিন্তা ম্লান হয়ে যায়, উচিত-অনুচিতের বোধ ভোঁতা হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার এই বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানাগুলোকে আবার চালু করার জন্য কী ব্যবস্থা নিয়েছে? বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধানতম খাত তৈরি পোশাক শিল্প ধুঁকছে। চলতি অর্থবছর কেটে যাবে যেমন-তেমন করে, কিন্তু আগামী বাজেটের জন্য তহবিল পাওয়া যাবে কোথায় থেকে? জিডিপি প্রায় তলানিতে, রপ্তানি আয় হুমকির মুখে। দান-অনুদানের খবরও হতাশাজনক। বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে জাতীয় সংস্কার, নির্বাচন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য কমিয়ে আনা ইত্যাদি। এর মধ্যে সংস্কার কমিশনগুলো মোটামুটি কাজ করেছে এবং অধিকাংশ কমিশনই তাদের রিপোর্ট দাখিল করেছে। সেসব রিপোর্টের কতটা বাস্তবায়ন হবে বা বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি কতখানি সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। জাতীয় ঐকমত্য একটা ব্যাপার, যেটা বাংলাদেশ তার সূচনা থেকেই দেখেনি। কথায় বলে, বাঙালি একাই একশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো একশ বাঙালি এক নয়। আমাদের এমন একটা ইস্যু নেই, যে ইস্যুতে দেশের আপামর জনসাধারণ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাই একমত হতে পারেন। এমন অবস্থায় সংস্কার প্রস্তাবগুলোও বাস্তবায়ন হবে কি না বলা মুশকিল। কারণ, সংসদবিহীন রাষ্ট্রকাঠামোয় ‘বিল’ পাস করানোর জন্য ঐকমত্যই ভরসা। তাই সরকারব্যবস্থা, সংবিধান, নির্বাচনী আইন, শিক্ষানীতি, বাণিজ্যনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারও সন্দিহান। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে প্রথমত বেকার হয়ে যায় এর শ্রমিক-কর্মচারী; দ্বিতীয়ত সেই কারখানার উৎপাদন থেকে প্রাপ্য আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। শ্রমিক-কর্মচারীরা বেকার হয়ে গেলে তাদের পরিবার দরিদ্র হয়ে যায় যেমন, তেমনি তাদের শ্রমশক্তি থেকে বঞ্চিত হয় অর্থনীতি। উল্টোদিকে তাদের দ্বারা সৃষ্ট নানামুখী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বিপর্যস্ত হয় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের বন্ধ হওয়ার পেছনের কারণ এগুলোর মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান। ষোলো বছর ধরে যখন একটি নির্দিষ্ট দল লাগাতার ক্ষমতাসীন থাকে, তখন দেশের সব মানুষকে, সব প্রতিষ্ঠানকে, সবগুলো খাতকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই দলের তথা সেই সরকারের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করতে হয়। বলা ভালো, করতে বাধ্য হয় তারা। আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে তার কোনো বিকল্প ছিল না এবং অন্য কোনো মেরূকরণের সুযোগই ছিল না। দেশের ব্যবসায়ী সমাজ সরকারের বা সরকারি দলের সঙ্গে হাত না মিলিয়ে কী করতে পারত? আওয়ামী লীগের শাসনকাল ছিল সর্বাত্মকবাদী, সর্বগ্রাসী। এমন কোনো খাত তারা বাদ রাখেনি, যে খাতে তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি। রাজনৈতিক প্রভাব বা সংশ্রব ছাড়া দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে তখন কিছুই করার ছিল না। আলপিন থেকে এরোপ্লেন কোনো কিছুই উৎপাদন-বিপণন করা সম্ভব ছিল না, সরকারি দলের সমর্থন-অনুমোদন ছাড়া।

বাংলাদেশের প্রত্যেক ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমদানিকারক, সরবরাহকারক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি, সরকারি দলের নেতা ও প্রশাসনের সঙ্গে ‘মিলিত হয়ে’, সরকারি দলের অনুগত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। কারও কারও যোগদান ও আনুগত্য স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি রাজনীতিক পরিচয়ও গ্রহণ করেছেন। এই সবকিছু মেনে নিয়েও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তাদের ব্যবসায়-উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য আবশ্যক ছিল। ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে’ তাদের কারখানা ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়ে কেবল তাদের শায়েস্তা করা হয়নি, বরং তার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে দেশের অর্থনীতিকে, জন্ম দেওয়া হয়েছে আরও নানারকম দুরবস্থার চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, দখল, লুটপাট, চাঁদাবাজি, মজুদদারি, কালোবাজারি এসবই হলো এই পরিস্থিতির উপজাত। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে ষাট-সত্তর হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর পুনরায় কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করা না গেলে, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

বন্ধ কারখানাগুলোর মালিকরা সবাই যে ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে’ ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন, এমনও না। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো অপরাধমূলক কাজেও জড়িত ছিলেন। তা যদি সত্যি হয়েও থাকে, তাহলে সেই অপরাধের বিচার করুন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিচার করুন, কিন্তু তাদের ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো বন্ধ করে রাখবেন না। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসক নিয়োগ দিন, যেভাবে বেক্সিমকোর মতো আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অপরাধগুলোকে ব্যক্তিপর্যায়ে বিবেচনা করুন ও সে সবের বিচার করুন, কিন্তু অপরাধীদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করে রাখবেন না। কেননা, এসব প্রতিষ্ঠানের নিম্নস্তরে কাজ করা শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের মালিকদের অপরাধের অংশীদার ছিলেন না। তারা তাদের শ্রম-ঘামের বিনিময়েই উপার্জন করছিলেন, সেই বৈধ ও সৎ উপার্জন বন্ধ করে দিলে তাদের সামনে অবৈধ ও অসৎ পথে উপার্জন তথা কেড়ে খাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। হচ্ছেও তাই। ঘরে-বাইরে কোথাও এখন আর দেশবাসী নিরাপদ নয়।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দুটো উপায় এক. অপরাধীর বিচার করা, দুই. অপরাধ করতে চাওয়া অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা। প্রথমটা অপরাধ সংঘটন-পরবর্তী ব্যবস্থা, দ্বিতীয়টা অপরাধ সংঘটনের আগেই নেওয়া ব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গত ছয় মাস ধরে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম ব্যবস্থাটা নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নয়। এর পেছনে অনেক কারণ দৃশ্যমান। অপরাধীর বিচার করতে গেলে সবার আগে অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে, তদন্ত করতে হবে ও অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে হবে, যাতে আদালত বিচার করতে পারেন। বাস্তবতা হলো, বিগত সরকারের পনেরো বছর ধরে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে গড়ে তোলা পুলিশ প্রশাসন বর্তমান সরকারের প্রতি একশভাগ অনুগত ও সহযোগিতামূলক নয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য এখনো বাহিনী থেকে অনুপস্থিত বা পলাতক রয়েছেন। যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মধ্যেও দায়িত্বপরায়ণতা ও দায়বদ্ধতা সেভাবে দৃশ্যমান নয়, কেবলই দায়ে পড়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশ। তদুপরি, নতুন নিয়োগ বন্ধ, চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া নিয়োগ বাতিল ইত্যাদি নানা কারণে বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ চূড়ান্ত পর্যায়ে। কেবল তাই নয়, নতুন যুগের নতুন বিচারব্যবস্থা ‘মব জাস্টিস’ পুলিশের মনোবলকে আরও বেশি দুর্বল করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ছাত্র-জনতা তথা ‘মব’ বাধ্য করেছে পুলিশকে তার ‘রেগুলার ডিউটি’ করা থেকে বিরত থাকতে। গত জুলাই-আগস্টে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ছিল পুলিশ বাহিনী। মুদ্রার এক পিঠে ‘ওপর মহলের আদেশে’ তাদের আক্রমণ করতে হয়েছে সন্তানতুল্য ছাত্রদের ওপর, গুলি চালাতে হয়েছে, হত্যা করতে হয়েছে নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের। মুদ্রার অপর পিঠ হলো তাদের নিজেদেরই আক্রান্ত হওয়া। থানা ও ফাঁড়িগুলোতে হামলা হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, খুনোখুনি হয়েছে। মাঠে থাকা পুলিশরা সরাসরি আক্রান্ত হয়ে হতাহত হয়েছেন। আগুনে পুড়িয়ে, পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে অসংখ্য পুলিশকে। পুলিশের অস্ত্র লুট হয়েছে। দপ্তরে থাকা পুলিশরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হয়েছেন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে, পরিবারের ওপর হামলা হয়েছে। ... কার্যত, এমন একটি পর্যুদস্ত বাহিনীর দ্বারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব। ফলে সরকারকে এখন তৎপর হতে হবে দ্বিতীয় ব্যবস্থা কার্যকরের চেষ্টায়। বৈধ উপার্জনের ব্যবস্থাগুলো পুনরায় সচল করে দিন, কর্মীর হাতকে কারখানায় ফিরিয়ে নিন, প্রাণঘাতী হাতিয়ার সে এমনিতেই ফেলে দেবে।

পুনশ্চ :  তৃতীয় আরেকটি গোষ্ঠী ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরা সংখ্যায় হয়তো অল্পসংখ্যক, কিন্তু কূটকৌশলে এরাই সবচেয়ে শক্তিশালী। এই গোষ্ঠীর শক্তি হলো গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে পারা। এরা পানির মতো, যে পাত্রে জমা হয়, সেই পাত্রের রঙ ধারণ করে। এরা সবার সঙ্গে মিশে যায়, কিন্তু নিজের চরিত্র ধরে রাখে। এক ঝুড়ি আপেলের মধ্যে একটা পচা আপেল রেখে দিলে রাতারাতি বাকি আপেলগুলোকেও পচিয়ে দেয়। ঠিক তেমনি, এই ক্ষুদ্র সংখ্যার প্রতিক্রিয়াশীলরা বড় বড় গোষ্ঠীর মধ্যে ঢুকে পড়ে তাদের প্রভাবিত করে, নিজেদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল চরমপন্থি বানিয়ে ছাড়ে। এরা কখনো ধর্মীয় গোঁড়ামি, কখনো জাতিগত বিদ্বেষ, কখনো উগ্র জাতীয়তাবাদ, কখনো ইতিহাস বিকৃতি, কখনোবা নারীবাদিতা/নারী নির্যাতনকে হাতিয়ার বানিয়ে নাগরিক অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি করে। ‘মব জাস্টিস’ এদেরই পেটেন্ট করা যুগান্তকারী ফর্মুলা প্রকাশ্য দিবালোকে শত্রু নিধন হয়ে যাবে, সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে, কিন্তু কেউ কিছু করতে পারবে না, নিজেরা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে! এদের সম্পর্কে কী করণীয়, কীভাবে এদের নির্মূল করা যায়, তা সরকারকে ভাবতে হবে। নির্মূল করা না গেলেও অন্তত নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে এই সরকারের ছোট-বড় সব সাফল্য/অর্জনই যে এই ঘুণপোকারা কুরে কুরে খেয়ে দেবে তা বুঝতে পারার মতো ‘কমনসেন্স’ যদি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ও নীতিনির্ধারকদের না থাকে, তাহলে তো সরকারের ষোলোআনাই বৃথা।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক

goonjohnr@gmail.com