মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতা এবং দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ‘মানবিক করিডর’ আপাতত হচ্ছে না। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মতি প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি ও আরও রোহিঙ্গা দেশে প্রবেশের আশঙ্কা করা হয়।
এ ছাড়া জাতিসংঘের এ প্রস্তাবে মিয়ানমার সরকার রাজি নয়। আবার ঢাকার সঙ্গেও এ নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি। তাছাড়া সহযোগিতা পাঠানোর ক্ষেত্রে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধসহ আরাকান আর্মিকে জাতিসংঘ থেকে যে সব শর্ত দেওয়া হয়েছে সেটিরও খেলাপ হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, করিডর ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু এবং আরাকান আর্মির আস্থাহীনতা এবং নেপিদোর রাজি না হওয়া এই মুহূর্তে মানবিক করিডর থেকে সরে আসার মূল কারণ।
জানা গেছে, এ বছরের মার্চে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময়ই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাতিসংঘ বাংলাদেশ থেকে মানবিক সহায়তা চ্যানেল চালু করতে চায়।
সফরের সময় এ প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছিলেন, মিয়ানমারের ভেতরে মানবিক সহায়তা জোরদার করা খুব দরকার। এতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে। আর এজন্য বাংলাদেশকে চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করতে অনুমোদন ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
জানা গেছে, গুতেরেসের সফরে সরকারের পক্ষ থেকে রাখাইনে মানবিক করিডরের নীতিগত সম্মতির কথা জানানো হয়। ঠিক সেই সময় থেকেই ঢাকার পক্ষ থেকে মানবিক চ্যানেল চালু করার বিষয়ে নেপিদোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। আবার জাতিসংঘ থেকেও এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু নেপিদো জাতিসংঘের প্রস্তাবে নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানায়। ঢাকাকেও এ বিষয়টি বলা হয়।
এদিকে জাতিসংঘের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে গত ২২ এপ্রিল পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন রাখাইনে করিডর দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত সম্মতির বিষয় জানান। এরপর থেকেই দেশের রাজনৈতিক দল ও কূটনৈতিক মহলে সমালোচনা শুরু হয়। যদিও তার দুদিন পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সরাসরি বলেছেন এ ধরনের করিডরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গতকাল রবিবারও রোহিঙ্গা বিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার কোনো ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। তিনি বলেন, মানবিক করিডর নিয়ে কেবল প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, কোনো চুক্তি নয়।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেন, করিডর কথাটি তিনি (জাতিসংঘ মহাসচিব) বলেননি, চ্যানেল বলেছেন। করিডরের একটি আইনগত অর্থ আছে। চ্যানেলের বিষয়টি তিনি (জাতিসংঘের মহাসচিব) আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেই বলেছেন। আমি যখন তার (জাতিসংঘ মহাসচিব) সঙ্গে গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেখা করতে গেলাম, আমাদের পরিকল্পনা, মিয়ানমার, আরাকান আর্মি কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা, সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই আমি জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে গিয়েছি। রাখাইনে যে মানবিক সমস্যা ও সংকট, সেটা মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের বিকল্প নেই। সেই কাজটি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই হবে।
করিডর নিয়ে যা যা হলো
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম. তৌহিদ হোসেন প্রথমে জানান, বাংলাদেশ নীতিগতভাবে করিডর ব্যবহারে সম্মত। তবে এই বক্তব্যের পর দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়, বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম, এনসিপি এবং সুশীল সমাজের সমালোচনার ফলে সরকার অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এক সেমিনারে স্পষ্ট করে বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। এখন প্রাথমিক আলোচনা চলছে।’
বিএনপি এবং অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করেছে, করিডর চালু হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একটি ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হয়ে উঠবে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মি মিলিতভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করবে। এই অভিযোগের পেছনে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় যে, রাখাইনে আরাকান আর্মির দখলের পর এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মানবিক করিডর দেওয়ার ব্যাপারে সরকার যে ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে তাতে দেশের ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির’ মুখে পড়বে।
আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে হবে জনগণের কাছ থেকে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদের কাছ থেকে।
জানা গেছে, মানবিক করিডর নিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে মিয়ানমার সরকার বলছে যে রাখাইনে কোনো মানবিক সংকট নেই এবং সেখানে কেউ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, এমন নজিরও নেই। তা হলে কেন মানবিক চ্যানেল চালু করা হবে।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান মানবিক সমস্যা ও সংকট মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য পাঠাতে চায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো চ্যানেল দিয়ে এই সাহায্য রাখাইনে পাঠানো সম্ভব নয়।