একজন কৃষক, শ্রমিক, মজুর বা চাকরিজীবী সরকারের কাছে যা চায়, তা খুবই সাধারণ ও ন্যায্য। তারা চায়, প্রতিদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে যেন তাদের পরিবার স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোনসহ সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে। তারা চায়, তাদের সন্তান যেন স্কুলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে এবং পড়াশোনা শেষে মেধার মূল্যায়নে একটি ভালো চাকরি পায়, যাতে তাদের সন্তানও ভালো জীবনযাপন করতে পারে। তারা চায়, হাসপাতালে গেলে উন্নত চিকিৎসা পাবে এবং থানা-পুলিশ, আদালতে ন্যায়বিচার পাবে। তারা চায়, সরকার যেন সবার জন্য সমান আইনের ব্যবস্থা করে। তাদের চাওয়া মোটেও বড় কিছু নয়, বরং খুবই মৌলিক এবং ন্যায্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ৫৪ বছরে এই সামান্য চাওয়াটুকুর অধিকাংশ পূরণ হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষণমুক্ত ও ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। এই লড়াইয়ে গরিব কৃষক, খেটে খাওয়া শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবাই একত্র হয়েছিল একটি সম্মিলিত স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য। যেখানে ক্ষমতাবানদের একচেটিয়া সুবিধা থাকবে না, বরং সব নাগরিকের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা, যেখানে থাকবে আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষা এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নিশ্চয়তা। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো এত বছরেও সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাধীনতার পরই শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার দ্রুত রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ, দুঃশাসন ও চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তন এবং দুর্নীতি-দলবাজির বিস্তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে দেয়। দেশ একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক স্বপ্নের পরিপন্থি হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রেবিন্দুতে এসেই দেশ ও রাজনীতি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, নারীশিক্ষা, জাতীয় ঐক্য ও বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ভিত্তি গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। শহীদদের চেতনা ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে কিছুটা হলেও রাজনৈতিক রূপ দিতে পেরেছিলেন তিনি। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের প্রয়াস অপূর্ণ থেকে যায়। এরপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দীর্ঘকাল দেশ শাসন করেন। এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক এক প্রকার ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুর্নীতি, সামরিক দমননীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পচন জাতিকে বিভ্রান্ত করে তোলে।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক যুগের সূচনা হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আওয়ামী লীগ (২০০৯-২০২৪) গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার বদলে বিরোধী দল-মত দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। একের পর এক প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে দলটি ক্রমে স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের রাষ্ট্র যেখানে থাকবে মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার– তা দিন দিন দূরের কল্পনা হয়ে ওঠে। ফলে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে নতুন করে রক্ত দিতে হয়। দেড় হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হন গণতন্ত্রের, ভোটের অধিকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের জন্য। এ এক করুণ বাস্তবতা যেখানে রাষ্ট্র আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ে। স্বাধীনতা কি শুধুই রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের নাম? নাকি একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক সমাজের প্রতিশ্রুতি? ২ মে ২০২৫, তারেক রহমান বলেছেন, ‘লাখো প্রাণের বিনিময় ১৯৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ, ’৭৫-এর ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবিরোধী তাঁবেদার মুক্ত বাংলাদেশ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী বাংলাদেশ এবং ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন প্রতিটি বাঁকে মানুষ কেন অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন? কি ছিল এই শহীদদের স্বপ্ন? তারা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য ৫৪ বছর সময় খুব বোধ হয় কম সময় নয়, এ জন্যই আমি মনে করি, শুধু শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হিসেবে সবার দায়িত্ববোধ শেষ হয়ে যায় না। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল আমরা তাদের সুমহান আত্মত্যাগের প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ১৯৭১ সাল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার।’ চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা, ভোটাধিকার হরণ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন যেমন ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটায়, তেমনি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নকে পুনরুজ্জীবিত করে। শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ার আকাক্সক্ষায় অনেক তরুণ জীবন উৎসর্গ করে। অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু নয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখনো নির্বাচন নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই, বরং সময়সূচি নিয়ে দ্ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। কখনো বলা হয় ডিসেম্বরেই নির্বাচন, আবার কখনো ২০২৬ সালের জুন যা সরকারের ভেতরের অস্পষ্টতা ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে কি রাজনৈতিক জটিলতা আরও বাড়বে!
শেখ হাসিনা সরকারের সময় গুম হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তার কিংবা পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ন্যায্য শ্রম মজুরি, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা, খাদ্য ও পানির নিশ্চয়তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও নাগরিক শিষ্টাচারের মতো মৌলিক ইস্যুতেও অগ্রগতি দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ভবিতব্য কী? পাঁচ আগস্টের পর শুরু হওয়া দমন-পীড়ন, গুম, সন্ত্রাস ও সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি যা সরাসরি চব্বিশের চেতনা ও জন-আকাক্সক্ষার পরিপন্থি। এসব ঘটনা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানে আহত পরিবারগুলোর অধিকাংশই এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি, আহতদের সুচিকিৎসাও নিশ্চিত করা যায়নি। গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস ও কয়েকজন উপদেষ্টা শুরু থেকেই ছাত্রদের প্রতি এক ধরনের পক্ষপাত দেখিয়েছেন, যা আন্দোলনের অন্য অংশীজনদের মধ্যে কিছুটা আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। ফলে এই সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও বটে। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকার যদি নিরপেক্ষতা হারায়, তবে তা শুধু চেতনার বরখেলাপই নয়, বরং জনগণকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিএনপির বিশ্বাস, ২০২৪ সালের আন্দোলন কেবল স্বৈরাচারী শাসনের পতনের নয়, এটি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আন্দোলন। যে আন্দোলনে গত সতেরো বছরে তাদের দলকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জন-আকাক্সক্ষা ও নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া নয় এটি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন এবং তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করে।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচন আয়োজন সময়ের দাবি। জনগণ প্রস্তুত তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগে, প্রয়োজন সরকারের দায়িত্বশীল ও কার্যকর উদ্যোগ। নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের উচিত, দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা। এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা শুধু যৌক্তিক নয়, বরং তা গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতের জন্য অপরিহার্য। কারণ নির্বাচন ছাড়া জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি মনে করে, জনগণের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন এখন সময়ের দাবি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক চেতনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এই চেতনা ধারণ করেই বিএনপি এগিয়ে চলেছে। তাদের ৩১ দফা কর্মসূচি জনগণের মৌলিক চাহিদা, অধিকার ও স্বপ্নকে বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামো পরিবর্তন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি একটি নতুন জীবনব্যবস্থার সূচনা করতে চায়। একাত্তরের স্বাধীনতার স্বপ্ন আর চব্বিশের পরিবর্তনের অঙ্গীকার এই দুই সময়ের মাঝে তারেক রহমান যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে চাচ্ছেন, তা আসলে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং প্রজন্মের আশা পূরণের দৃঢ় সংকল্প। এরই মধ্যে যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংগঠনিক সম্পাদক, ডিইউজে
sayed.reporter@gmail.com