‘স্বাস্থ্যব্যবসা’র নাম হোক ‘স্বাস্থ্যসেবা’

আমাদের দেশের ‘স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ নিয়ে কথা হচ্ছে, দীর্ঘসময় ধরে। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অমানবিকতা এবং কার্যকরহীনতায় এই খাত নিমজ্জিত। মূলত স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হয়েছে স্বাস্থ্যব্যবসায়। যে কারণে মানুষের যৌক্তিক প্রাপ্যটুকু অবহেলিত থেকে গেছে। যদিও মৌলিক অধিকারের মধ্যে ‘স্বাস্থ্য’ রয়েছে, বাস্তবে যা শুধু কেতাবি। উপরন্তু সেবার নামে কোটি কোটি টাকার মচ্ছব হয়েছে। সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয়নি। আমরা ভুলে যাই, স্বাস্থ্যসেবা শুধু রোগ নিরাময়ের বিষয় নয়। বরং পুরো ব্যবস্থাকে মানবিক ও কার্যকরভাবে গড়ে তোলার বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে ডাক্তার-রোগী অনুপাতে একটি তীব্র অসমতা রয়েছে, যেখানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৫.২৫ ডাক্তার। স্বাস্থ্য খাত যদিও উন্নতির পথে, তবু সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের জন্য এটি মহাসংকটের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর আশপাশে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য ডায়াগনস্টিক  সেন্টার ও ক্লিনিক রোগীদের জন্য এক বিশাল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রোগীদের জিম্মি করে পরিচালিত হচ্ছে শক্তিশালী বাণিজ্য। যেখানে দালালদের প্রতারণার শিকার হাজারো মানুষ।

স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ১৮(১)-এ চিকিৎসাসেবা ও জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন থেকে যেসব সমস্যা রয়েছে, তা নিরসনে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যেসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নযোগ্য, তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করার পর তিনি এই নির্দেশ দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। ‘স্বাস্থ্য সবার অধিকার’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাও তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জন্য পৃথক স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, অতি দরিদ্র ২০ শতাংশ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া, মেডিকেল পুলিশ গঠন, জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, নতুন আইন প্রণয়ন ও পুরনো আইনের সংশোধন, ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের চেম্বার ও হাসপাতালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ মোটা দাগে ৩২টি সুপারিশ করেছে কমিশন। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন কমিশনপ্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা তদারকি করবে। কমিশনপ্রধান উপদেষ্টার কাছে জবাবদিহির আওতাভুক্ত থাকবেন এবং ১৭টি বিভাগের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন।’ এতে বলা হয়েছে, একটি পৃথক ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন’ প্রণয়ন করতে হবে, যা বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির ব্যাপারে নাগরিকদের অধিকার ও রাষ্ট্রের কর্তব্য নির্ধারণ করবে।

বিদ্যমান আইন এবং বিধানাবলি যুগোপযোগী না করা হলে সুপারিশগুলোর প্রয়োগে সমস্যা হতে পারে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মোট সেবার দুই- তৃতীয়াংশ ভূমিকা রাখে  বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো, অর্থাৎ রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসব  বেসরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তুলনায় বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রায় ১০ গুণ। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তা এক ভয়াবহ বাস্তবতা। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ জাতীয় বাজেটের মোট ব্যয়ের তুলনায় এখনো কম। খেটে খাওয়া মানুষকে সরকারি খরচে পাঁচ ধরনের সেবা দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত রোগপ্রতিরোধ, দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্য উন্নয়ন, তৃতীয়ত চিকিৎসা, চতুর্থত পুনর্বাসন এবং সর্বশেষ উপশমমূলক চিকিৎসা। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো শৈথিল্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সময়সীমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কবে নাগাদ এসব সুপারিশ আলোর মুখ দেখবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অবশ্যই স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। কারণ সরকার নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার। স্বাস্থ্যব্যবসার নাম হোক স্বাস্থ্যসেবা।