‘আমার মৃত্যুর জন্য মা এবং বউ কেউ দায়ী না। আমিই দায়ী, কাউকে ভালো রাখতে পারলাম না।’ অফিসরুমে মেঝেতে পড়ে আছে রক্তাক্ত দেহ। আর পাশের টেবিলে চিরকুটে লেখা আছে এসব কথা। ওই চিরকুটে আরও লেখা আছে, ‘বউ যেন সব স্বর্ণ নিয়ে যায় এবং ভালো থাকে। মায়ের দায়িত্ব দুই ভাইয়ের ওপর। তারা যেন মাকে ভালো রাখে। স্বর্ণ বাদে যা আছে তা মায়ের জন্য। দিদি যেন কো-অর্ডিনেট করে।’
গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের র্যাব-৭ কার্যালয় থেকে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পলাশ সাহার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সকাল ১০টায় অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে নিজের অফিসরুমে ঢোকেন তিনি। এরপর হঠাৎ গুলির শব্দ শোনেন তার সহকর্মীরা। দ্রুত তার অফিসকক্ষে গিয়ে দেখতে পান নিথর পড়ে আছেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার। পলাশ আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
জানা যায়, পলাশ সাহা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার তারাশী গ্রামের মৃত বিনয় কৃষ্ণ সাহার ছেলে। তিনি র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিসিএস ৩৭ ব্যাচের ক্যাডার। চাকরির সুবাদে স্ত্রী সুস্মিতা সাহা ও মা আরতি সাহাকে নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাস করতেন।
র্যাব-৭-এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পলাশ সাহা অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় অস্ত্র ইস্যু করে নিজের অফিসকক্ষে প্রবেশ করেন। কিছু সময় পর গুলির শব্দ শুনে দায়িত্বরত অন্যান্য র্যাব সদস্য সেখানে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পলাশ সাহাকে পড়ে থাকতে দেখেন।’
র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এআরএম মোজাফফর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পলাশ সাহা নিজের ইস্যু করা পিস্তল দিয়ে সুইসাইড করেছেন। আমরা গুলির শব্দ শুনে রুমে গিয়ে তার গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করি। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুইসাইড নোট তার হাতে লেখা কি না, বিষয়টি তদান্তাধীন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।’
এদিকে সাংসারিক বিবাদ থেকে পলাশ সাহা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে তার পরিবার ধারণা করছে। পলাশের মেজো ভাই নন্দলাল সাহা বলেন, ‘দুই বছর আগে ফরিদপুরের চৌধুরীপাড়ায় পলাশ বিয়ে করে। বিয়ের ছয়-সাত মাস পর থেকেই তাদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। সবসময় কলহ লেগেই থাকত। পলাশ তার স্ত্রী ও মাকে ভালোবাসত। বুধবার সকালেও পলাশ ও তার স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয়। বোধহয় এ কারণেই অভিমানে পলাশ আত্মহত্যা করেছে বলে আমাদের ধারণা।’
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনাস্থলে পরিবারের বিষয়ে তার লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথাও বলেছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণ করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। বাকিটা তদন্ত ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বামীর মরদেহ দেখার সময় পলাশ সাহার স্ত্রীর আশপাশে মহিলা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। পরে দুপুর ২টার পর দুই মহিলা পুলিশ সদস্য দুই পাশে তার হাত ধরে জরুরি বিভাগের সামনে থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় আবোলতাবোল বিলোপ করে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। পুলিশের তথ্যে, পলাশ সাহার স্ত্রী বর্তমানে র্যাব-৭-এর হেফাজতে রয়েছেন। পতেঙ্গায় সদর দপ্তরে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
র্যাবের হেফাজতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘উনি (পলাশ সাহার স্ত্রী) এখন র্যাবের হেফাজতে আছেন। নিহতের আত্মীয়স্বজন এখনো চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাননি। উনারা পৌঁছার পর কোনো অভিযোগ করলে সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ বিকেলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার ওসি মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘পরিবারের কেউ অভিযোগ করলে তাহলে উনার বিরুদ্ধে আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা হতে পারে। সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’