অতি গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে চলছে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও মানববন্ধন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার শর্তপূরণ ও অঙ্গীকার করে প্রকল্প এলাকায় নিউক্লিয়ার ফুয়েল (ইউরেনিয়াম) আমদানি ও সংরক্ষণের অনুমোদন পায় বাংলাদেশ। কয়েক ধাপে আনা পরমাণু জ্বালানি এখন প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে থাকা কেপিআইভুক্ত রূপপুর প্রকল্প এলাকা অতি স্পর্শকাতর। চলমান পরিস্থিতিতে কাজের অগ্রগতি, নিরাপত্তা ও পরবর্তী ধাপের আন্তর্জাতিক অনুমোদনও হুমকিতে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্প সূত্র জানায়, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ গত কয়েকদিন ধরে প্রকল্প এলাকায় আন্দোলনে নেমেছেন। ২৮ এপ্রিল থেকে চলছে আন্দোলন। প্রকল্প এলাকা ছাড়াও গত ৬ মে বিকেল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থল ত্যাগ করে উপজেলা সদরে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জ্যেষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক ফাহিম শাহরিয়ার।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রায় এক দশক আগে এনপিসিবিএল গঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনো সার্ভিস রুল প্রকাশ হয়নি। নেই কোনো অর্গানোগ্রাম। দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন ও পদোন্নতি নেই। বেতন বৈষম্য ও সুযোগ-সুবিধা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে। শৌচাগার, স্বাস্থ্য ও মানবিক সুব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়নি। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। আন্দোলনকারীরা এ সময় সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক এবং এনপিসিবিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছানের অপসারণ দাবি করেন।
তবে অতি ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প এলাকায় আন্দোলন কর্মসূচি করা উচিত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, নিউক্লিয়ার প্লান্ট এলাকায় এমন কর্মসূচি পালনের নজির বিশ্বে কোথাও নেই। এ ধরনের সংস্কৃতি এখানে শুরু হলে এ কেন্দ্র চালানো বিপদজনক হয়ে যাবে। সেফটি কালচার, সিকিউরিটি কালচার, কোড অব কন্ট্রাক্ট সবকিছু মেনে চলতে হবে। আন্দোলনরতদের সঙ্গে যদি কোনো বৈষম্য হয়ে থাকে সেটারও নিরসন করতে হবে। তবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।
মঙ্গলবার (৬ মে) রাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে এনপিসিবিএলের সচিব এস আব্দুর রশিদ স্বাক্ষরিত ই-মেইলে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি ‘১ক’ শ্রেণিভুক্ত কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা)। তাই প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রকল্প এলাকা বা সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সকল প্রকার শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যাতে কোনো প্রকার শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক, সচেতন থাকতে হবে। তবে এই নোটিশ পাওয়ার পরও বুধও বৃহস্পতিবার প্রকল্প এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়।
এনসিপিবিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাছান বলেন, মাত্র চার মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রমোশন, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, গ্রেড বৃদ্ধি, সার্ভিস রুলসহ নানা দাবি তুলেছেন। আমরা কনস্ট্র্রাকশন প্লান্টে কাজ করি। সকল দাবি-দাওয়া এককভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এগুলো সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত সাপেক্ষ বিষয়। এনবিপিসিএল নতুন কোম্পানি হওয়ায় এবং দেশে পারমাণবিক স্থাপনা না থাকায় সার্ভিস রুলসের মত বিষয়গুলো নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়, তাই বিলম্বিত হয়েছে। তবে আমি সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি যা পরবর্তীতে বাস্তবায়ন হবে।