গত ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবনের পঞ্চমতলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর এজলাসে অনেক মানুষের ভিড়ে এক কোনায় দাঁড়িয়েছিল তিন কিশোর। তাদের পরনে পরিপাটি পোশাক, তবে ভীতসন্ত্রস্ত। এদিক-ওদিক ইতিউতি চাইছিল তারা। প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা তাদের।
কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি গোপীবাগে মারামারির ঘটনায় ১০ ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩২৩ ও ৩৭৯ ধারায় অভিযোগ এনে মামলা করেছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। আদালতে হাজিরা দিতে এসেছে তারা। আগেও কয়েকবার আসতে হয়েছে। তাদের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী, একজন এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র, আরেকজন আপাতত পড়াশোনা না করলেও তার বয়স ১৭ বছরের বেশি নয়।
তিন কিশোরের আইনজীবী মো. বাবুলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুজন ঘটনার পরেই জামিন পেয়েছে আর একজন কিছুদিন আগে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। মামলার কারণে তাদের অভিভাবকরা সামাজিক, পারিবারিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ওদের পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে।’ এসএসসিপড়ুয়া কিশোর বলে, ‘আমরা তো কোর্টে আসতে চাইনি। এখানে আসতে ভালো লাগে না।’ এইচএসসিপড়ুয়া কিশোর বলে, ‘মামলার পর আমাদের বন্ধুরা হাসি-তামাশা করে। খেলায় নিতে চায় না। বাসার সবাই কেমন জানি করে।’
২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের তারানগরের স্থানীয় এক নারী ও পুরুষকে মারধরের ঘটনায় আসামি করা হয় পাঁচজনকে। তাদের একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। এসএসসিপড়ুয়া ওই কিশোরের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেওয়ার পর বিচার শুরুর আদেশ হয় ঢাকার শিশু আদালতে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩)। মামলার আট সাক্ষীর একজনও সাক্ষ্য দিতে আসেনি এখনো। ওই কিশোরের আইনজীবী মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার পর তার লেখাপড়া বিঘ্নিত হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে ছেলেটি। তার পরিবারও হতাশ।’
মামলার বেড়াজালে আটকে বিবর্ণ হচ্ছে শত শত শিশু-কিশোরের ভবিষ্যৎ। তাদের অনেকে জড়িয়ে পড়ছে হত্যা, ধর্ষণ, মাদকসেবন, মারামারি ও চুরির মতো ফৌজদারি অপরাধে। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিশু আদালতগুলোতে বিচারাধীন (গত মার্চ পর্যন্ত) মামলার সংখ্যা সাড়ে ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। গত দেড় বছরে চার হাজারের বেশি মামলা বেড়েছে শিশু আদালতগুলোতে। তবে সাড়ে ৪২ হাজার মামলায় কতসংখ্যক শিশু আইনের ফয়সালা পেয়েছে জানাতে পারেনি সুপ্রিম কোর্ট, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পৃথক শিশু আদালত না থাকা, বিচারক স্বল্পতা ও মামলাজটে বিচারাধীন মামলা বাড়ছে। শিশুদের অপরাধ প্রবণতা থেকে নিবৃত্ত রাখার কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো নয়। ফলে দিনের পর দিন তাদের হাজিরা দিতে হচ্ছে। শিশু-কিশোর ও তাদের পরিবার নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুরা বড় হচ্ছে নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, শিশু অধিকারকর্মী এবং শিশুদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এমন পাঁচজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা অভিন্ন সুরে বলেছেন, শিশুরা সংবেদনশীল। নানা কারণে তাদের অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত শিশুসুলভ পরিবেশ নেই। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে হাতে মোবাইল। পারিবারিক বন্ধনও আলগা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং দেশের আনাচে-কানাচে; এ ছাড়া নানা নেতিবাচক কর্মকান্ড হয়। মামলার অভিজ্ঞতা নিয়ে যেসব শিশু বড় হয় তাদের মধ্যে বেপরোয়া ও হিংস্র মনোভাব কাজ করে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না মনে করেন, শিশু আদালতে সাড়ে ৪২ হাজারের বেশি মামলা খুবই অ্যালার্মিং। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজে, পরিবারে এত নেতিবাচক কর্মকা- যে, শিশুদের ওপর এসবের প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে তাদের সংশোধন যেমন হচ্ছে না তেমনি বিচারেও দীর্ঘসূত্রতা। শিশুদের অপরাধপ্রবণতার বিষয়ে, মামলা বাড়ার বিষয়ে; বিভিন্ন প্রতিকারের বিষয়ে ভাবার কথা রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র উদাসীন। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও নেতিবাচক হবে।’
আইনে যা আছে : ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর ‘অপরাধমূলক’ কর্মকা-ে অভিযোগ দায়ের করা যায় না। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু গণ্য করা হয়। ১০ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের করা অপরাধ অভিযোগ হিসেবে গণ্য হলেও তাদের আসামি বলা যাবে না এবং কোনো মাধ্যমে তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। তাদের অপরাধের বিচার হবে শুধু শিশু আদালতে ও শিশু আইনে। সরকারের সিদ্ধান্ত ও আইনের বিধান অনুযায়ী, দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলো শিশু আদালত গণ্য হবে। শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের অপরাধ গুরুতর হলেও তাদের সর্বোচ্চ ১০ বছর আটকাদেশ দেওয়া যাবে এবং তাদের কারাগারে না পাঠিয়ে পাঠাতে হবে উন্নয়ন কেন্দ্রে। একই সঙ্গে শিশুর সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অবহেলামূলক আচরণ করা যাবে না। আদালতের পরিবেশ হতে হবে শিশুসুলভ। অর্থাৎ প্রচলিত আদালতে যেভাবে বিচার হয় সেভাবে শিশু আদালতের বিচার করা যাবে না।
সম্প্রতি ঢাকার ছয়টি শিশু আদালত (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে শিশু আদালতের উপযোগী পরিবেশ প্রায় নেই। আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিচারকস্বল্পতা, সীমিত অবকাঠামো, জনবলের সংকট, মামলার জট এবং মানুষের ভিড়ে আদালতে শিশুসুলভ পরিবেশ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব।
বিচারাধীন সাড়ে ৪২ হাজার মামলা : সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিশু আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪২ হাজার ৫৭৯। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলা ২ হাজার ৪২৯টি; উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে ২৯টি মামলা। সবচেয়ে বেশি মামলা বিচারাধীন ঢাকার ছয়টি শিশু আদালতে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২ হাজার ১৯৮, কক্সবাজারে ১ হাজার ৬৩১, সিলেটে ১ হাজার ৪৫১, গাজীপুরে ১ হাজার ৩৮২, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৩১৯ মামলা বিচারাধীন। সবচেয়ে কম মামলা বিচারাধীন রাঙ্গামাটি শিশু আদালতে, ৮৪টি। পঞ্চগড়ে ৯৭, ঝালকাঠিতে ১১২, মেহেরপুরে ১২৮ ও খাগড়াছড়িতে ১৮৫ মামলা বিচারাধীন। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শিশু আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৮ হাজার ৪২৭। দেড় বছরে মামলা বেড়েছে ৪ হাজার ১৫২টি।
৮৫০-এর বেশি শিশু অপেক্ষায়: বৈচারিক বিষয়ে শিশুদের প্রচলিত কারাগারে নয়, তাদের রাখা হয় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। দেশে তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। একটি গাজীপুরের টঙ্গীতে বালকদের জন্য, আরেকটি গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে বালিকাদের জন্য। অন্যটি যশোরের পুলেরহাটে বালকদের জন্য। এসব কেন্দ্রের দেখভাল করে জাতীয় সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ ও সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রায়ই নেতিবাচক ও উদ্বেগের খবরের শিরোনাম হয় উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো।
উন্নয়ন কেন্দ্রে দায়িত্বরতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অনুমোদিত আসন ৩০০ হলেও সেখানে গত ৬ মে পর্যন্ত ছিল ৫৪৪ শিশু। এ কেন্দ্রে বিচার শেষে আটকাদেশে আছে তিন শিশু। কোনাবাড়ীতে মেয়ে শিশুদের জন্য সংরক্ষিত কেন্দ্রটি ১৫০ জনের। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ছিল ১০১ শিশু। যশোরের পুলেরহাটে বালক শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রটি ১৫০ জনের হলেও সেখানে গত ৬ মে পর্যন্ত ছিল ২২০ শিশু; এদের মধ্যে বিচার শেষে আটকাদেশে আছে তিন শিশু। অর্থাৎ ৬০০ বন্দির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে ৮৬৫ জন শিশু। যাদের বেশিরভাগের জামিন কিংবা বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু মামলায় জড়ালে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘এ ব্যর্থতা কার? যারা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে থাকেন তাদেরই। আমাদের দেশে শিশুদের অপরাধপ্রবণতা কেন বেশি, কেন তাদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না, কেন তাদের দাগি আসামিদের সঙ্গে হাজিরা দিতে হবে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি।’