আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্ত—ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ইউরোপের কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপ জয়ের দীর্ঘ খরা ঘোচাতে মরিয়া ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) নজর এখন ইতালির এই সফল কোচের দিকে।
চলতি মে মাসের ২৬ তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ। তার বিদায় ঘণ্টা বাজবে রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইতোমধ্যে এগিয়ে আছেন সাবেক শিষ্য জাবি আলোনসো।
বিশ্বের পাঁচটি ভিন্ন দেশে লিগ শিরোপা জয়ের কীর্তিমান আনচেলত্তিকে ঘিরে সিবিএফ-এর উচ্চাশা অমূলক নয়। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশ্লেষক টিম ভিকারি বলেন, 'তিনি এক অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। তার কোচিংয়ের সাফল্যই তার যোগ্যতা প্রমাণ করে।'
হোঁচট খাওয়া ব্রাজিলের বাস্তবতা
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে গেছে ব্রাজিলের জন্য। সর্বশেষ ২০০২ সালে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা জিতেছিল তারা। এরপর থেকেই টুর্নামেন্টের মঞ্চে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষদের সামনে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে সেলেসাও।
২০১৪ সালে নিজেদের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া, ২০১৮-তে বেলজিয়ামের কাছে বিদায়, আর ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে পরাজয়—এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ফুটবল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলটিকে ভাবিয়ে তুলেছে।
বর্তমান বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও অবস্থা আশঙ্কাজনক। আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর ছাঁটাই করা হয় কোচ দরিভাল জুনিয়রকে। তার আগেও তিতে কিংবা অন্যরা ব্যর্থ হয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে।
বিদেশি কোচের পথে সাহসী সিদ্ধান্ত
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে বিদেশি কোচ নিয়োগ একপ্রকার অভূতপূর্ব ঘটনা। ১০০ বছরেরও বেশি সময়ে মাত্র তিন জন বিদেশি—তাও মাত্র সাতটি ম্যাচে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে অ্যাঞ্জেলত্তির আগমন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
২০১৯ সালে পর্তুগিজ কোচ জর্জ জেসুস ফ্লামেঙ্গোতে এসে ঘরোয়া এবং কনটিনেন্টাল সাফল্য এনে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশের কোচিং সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে জাতীয় দল পর্যন্ত।
আনচেলত্তি কী আনবেন?
তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শৃঙ্খলা ও স্থিতি এনে দেওয়া। কাঁধ উঁচিয়ে, ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ পড়তে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারদর্শী এই কোচের অধীনে ড্রেসিংরুমে শৃঙ্খলা আসবে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ২০২২ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়—যেখানে চেলসি, ম্যান সিটি ও লিভারপুলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে জয় পাওয়া—আনচেলত্তির কৌশল ও মানসিকতা তৈরির দক্ষতার প্রমাণ।
ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের জন্য আশার নাম
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রদ্রিগোর মতো তরুণ ব্রাজিলিয়ান তারকারা আনচেলত্তির অধীনে রিয়াল মাদ্রিদে খেলছেন উজ্জ্বলভাবে। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস তার ক্লাব ক্যারিয়ারে জ্বলে উঠলেও জাতীয় দলের হয়ে তার পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে অনুজ্জ্বল। কোচ আনচেলত্তি যদি ক্লাবের মতো জাতীয় দলেও তার আত্মবিশ্বাস ও ছন্দ ফিরিয়ে দিতে পারেন, তাহলে সেটা হবে বড় সাফল্য।
নেইমারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপেও যদি জ্বলে ওঠার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন এই কোচ, তাহলে সেটা হতে পারে ইতিহাস বদলে দেওয়ার গল্প।
সমালোচনার ঝুঁকি, কিন্তু সম্ভাবনারও বিশাল জানালা
যদিও ব্রাজিলের কোচিং মহলে এই বিদেশি আগমনকে অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না, তবে আনচেলত্তির অবস্থান এতটাই দৃঢ় যে খেলোয়াড়দের ওপর নেতিবাচক চাপ আসবে না বলেই বিশ্বাস বিশ্লেষকদের।
শেষ পর্যন্ত, এটা কেবল এক কোচ নিয়োগ নয়—এটা ব্রাজিল ফুটবলের একটি নতুন দর্শনের সূচনা। যেখানে 'সাম্বা স্টাইল' আর বাস্তবতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারেন কার্লো আনচেলত্তি।
তাকে ঘিরে সেলেসাওর স্বপ্ন—শুধু ঘুরে দাঁড়ানো নয়, বিশ্বসেরা হয়ে ওঠা। এবার কি সেই স্বপ্ন সত্যি হবে?