বাংলাদেশ-জাপান বৈঠক

ঢাকার সঙ্গে দিল্লি-বেইজিং সম্পর্ক জানতে চাইতে পারে জাপান

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান। এ দুই প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে ঢাকার বর্তমান কূটনৈতিক ভারসাম্য সম্পর্কে ধারণা পেতে বেশ কিছু মাস ধরেই সক্রিয় রয়েছে টোকিও।

এই প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে বসছে বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক, যেটি ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ বা এফওসি নামে পরিচিত। আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এজেন্ডায় রয়েছে ভারত ও চীন সংক্রান্ত আঞ্চলিক ইস্যু। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ঢাকার সঙ্গে দিল্লি ও বেইজিংয়ের বর্তমান অবস্থান জানতে চাইতে পারে জাপান।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এফওসি বৈঠকটি দুইটি পৃথক পর্বে অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা নিবদ্ধ থাকবে আঞ্চলিক বিষয়ে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি ঘিরে। এ অংশে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভারত-সংক্রান্ত আলোচনাও উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের বক্তব্য শোনার পর জাপানও তাদের অবস্থান তুলে ধরবে। এমনকি টোকিওর পক্ষ থেকে এ ধরনের আহ্বান আসতে পারে যে, বাংলাদেশ যেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অধিকতর গুরুত্ব দেয়। একইসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসতে পারে জাপানের “বিগ-বি” প্রকল্প—যা সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং এতে ভারতকে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

চীনের প্রসঙ্গ এ আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ও নীতি নির্ভরতা কতটা, তা জানতে আগ্রহী টোকিও। আলোচনায় তিস্তা নদী প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের ভূমিকা ও অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে জাপানের উদ্বেগ রয়েছে। তারা জানতে চাইতে পারে, বাংলাদেশ চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে কি না এবং ভারতের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্কের বাস্তব চিত্র কেমন। আমাদের অবস্থান খুবই পরিষ্কার—একজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে অন্যজনকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। চীন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ভারতও তেমনি। কোনো পক্ষকেই আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো সময় সম্পর্ক উন্নত হতে পারে, আবার কখনও কিছুটা শীতলতাও আসতে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ সব সময় খোলা থাকে।”

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এক সাবেক রাষ্ট্রদূত, যিনি পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকতে চেয়েছেন, বলেন, “কূটনীতির ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের হয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া বা মধ্যস্থতা করার বিষয়টি নতুন নয়। বহু সময় দেখা যায়, একটি দেশ সরাসরি বার্তা না দিয়ে অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেয়। জাপান যেমন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ, তেমনি তাদের ভারতের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় ভারতের হয়ে জাপান এমন দূতিয়ালি করতেই পারে। তবে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সুষ্ঠু রাখা দু’দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।”

এবারের এফওসি আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বাঞ্চলবিষয়ক সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম। তিনি পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিনের পরিবর্তে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। অপরদিকে, জাপানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির সিনিয়র ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার আকাহোরি তাকেশি।

বৈঠকের প্রথম পর্বে আলোচনা হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক, অর্থনৈতিক ও খাতভিত্তিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা জোট, সাংস্কৃতিক বিনিময়, জনগণের মধ্যকার সংযোগ, মিয়ানমার সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে।

দ্বিতীয় পর্বে আলোচনার বিষয়বস্তু হবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়াভিত্তিক আঞ্চলিক প্রসঙ্গ এবং চীন। পাশাপাশি, বৈশ্বিক ইস্যু ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকগুলোতেও মনোযোগ থাকবে।

সরকারি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আলোচনার বিষয় হবে। এ ছাড়া, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন জাপান সফরও আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেটিকে দুই দেশই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।

এই প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিইচি সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আশাবাদী, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শিগগিরই জাপান সফরে যাবেন। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। জাপান বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার। পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে উভয় দেশই আগ্রহী।”

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ এফওসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের জুন মাসে ঢাকায়। আজকের এই সভাটি হবে বাংলাদেশ-জাপান এফওসির ষষ্ঠ অধিবেশন।