দ্রুত শাস্তি নেই তাই...

শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন চলছে দীর্ঘসময়। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পাড়া-মহল্লা সব জায়গাই শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, যে ঘর শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা, সেই পরমাত্মীয়ের বাড়িও নিরাপদ থাকছে না। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, শৈশব কেন অনিরাপদ? এটা কি মানসিক বিকৃতি, দরিদ্রতা, নাকি পারিবারিক সমস্যা? অথবা বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বা শৈথিল্য! ইউনিসেফের তথ্যমতে, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ৩৭ কোটি নারীর প্রতি আটজনে একজন ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার। কয়েক বছর আগে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে গত ৮ বছরে ৩ হাজার ৪৩৮টি শিশু ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে আরও বেশি। এদের মধ্যে অন্তত ৫৩৯ জনের বয়স ছয় বছরের কম। আর সাত থেকে বারো বছরের মধ্যে আছে ৯৩৩ জন।  গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিচিতদের দ্বারাই শিশুরা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার। 

সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশু নির্যাতন ও শিশুহত্যার মতো অপরাধ বাড়ছে, অন্যদিকে শিশু আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনিক নানা দুর্বলতায় শিশুর সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামাজিক অস্থিরতা আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় আইন নিজের মতো করে, নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে অন্য অপরাধের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের হার বেড়েছে। তারা আরও মনে করেন, এ ধরনের অপরাধ রোধে আইন প্রয়োগে আরও কঠোরতা দেখাতে হবে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্তদের সাজা হয় কম। অধিকাংশই বিচার কার্যালয় থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়। একটি মহল মনে করে, অধিকাংশ ধর্ষণের মামলার অভিযোগ থাকে মিথ্যা। ফলে আদালতে সেটা প্রমাণ হয় না। আবার আরেকটি মহল মনে করে, অভিযোগ মিথ্যা নয়। আইনের নানান জটিলতার কারণেই আসামিরা ছাড় পেয়ে থাকে এবং এ কারণেই ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। আর অশিক্ষা, মানসিক সমস্যা এবং আইনি দুর্বলতা তো রয়েছেই। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সভ্যতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল মাগুরায় আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। শিশুটির সুস্থতা কামনায় দেশ জুড়ে প্রার্থনা হয়েছিল, দোষীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের জন্য রাস্তায় নেমেছিল মানুষ। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সংশোধন হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এই প্রেক্ষিতে বিচার শুরুর ২১ দিনের মাথায় শনিবার মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় হিটু শেখকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছে আদালত। মামলার প্রধান আসামি শিশুর বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে আদালত মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছে। গত ৬ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার শিশুটি তার বোনের বাড়ি বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হয়। সাত দিন পর ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায় শিশুটি।

পৃথিবীর অনেক দেশে ধর্ষকদের শাস্তি হিসেবে অল্প সময়ে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের দেশে দ্রুততম সময়ে বিচার হলেও, ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। অন্যদিকে চীনে ধর্ষণ প্রমাণ হলেই কোনো সাজা নয়, বিশেষ অঙ্গ কর্তন এবং সরাসরি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। ইরানে ধর্ষককে ফাঁসি, না হয় সোজাসুজি গুলি করে হত্যা। আফগানিস্তানে ধর্ষণ করে ধরা পড়লে চার দিনের মধ্যে ধর্ষককে মাথায় সোজাসুজি গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর। উত্তর কোরিয়ায় ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, গুলি করে হত্যা করা হয়। সৌদি আরবে জুমার নামাজের পর ধর্ষককে প্রকাশ্যে শিরেদ করা হয়। মিসরে ধর্ষককে জনসম্মুখে ফাঁসি দেওয়া হয়। শিশু ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো এ পাশবিক অপরাধ দমনে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, আইনের দ্রুত কার্যকারিতার প্রতি ভয় না থাকলে অপরাধ কমে না।