বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও আশঙ্কাজনক হারে পৃথিবীর মেরু অঞ্চল গলে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলেছেন, এরইমধ্যে যে হারে বরফগলছে তাতে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশসহ উপকূলীয় অঞ্চলের দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও কমে সীমাবদ্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (২০ মে) গবেষণাটি কমিউনিকেশনস আর্থ এন্ড এনভাইরোনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি গবেষণা দলে যুক্ত ছিলেন ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন ও ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল এনভাইরোনমেন্ট রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতা বৃদ্ধির লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে কী প্রভাব ফেলতে পারে — এই দুটি অঞ্চল বিশ্বের প্রায় ৬৫ মিটার সমান সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বরফ ধারণ করে।
গবেষণা বলছে, ১৯৯০-এর দশক থেকে বরফ গলার হার চারগুণ বেড়েছে, এবং বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন টন বরফ গলছে। এখনকার উষ্ণতা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় আনুমানিক ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি (আইপিসিসি-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী)।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, ১.৫ সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আগামী বছরগুলোতে কয়েক মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় এবং দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর মানুষদের জন্য খাপ খাওয়ানো অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
গবেষকদের মতে, বিশ্বের নীতিনির্ধারক ও সরকারগুলোকে ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতা বৃদ্ধির বরফ অঞ্চল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর প্রভাব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ২৩ কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক মিটার উচ্চতায় বা তারও নিচে বসবাস করছে, এবং গলতে থাকা বরফ তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে — বিশেষ করে নিম্নভূমির দেশগুলোর জন্য।
এই পরিস্থিতি এড়াতে হলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা আজকের তুলনায় আরও কম হতে হবে — গবেষকদের মতে, এটি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা তারও কম হওয়া উচিত।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক ক্রিস স্টোকস বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ অঞ্চলের জন্য ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস খুব বেশি — এ বিষয়ে ক্রমবর্ধমান প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা বহুদিন ধরেই জানি যে, আগামী কয়েক দশক থেকে শতাব্দীর মধ্যে কিছুটা সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি অনিবার্য। কিন্তু বর্তমানে বরফক্ষয়ের যে গতি দেখা যাচ্ছে তা উদ্বেগজনক।’
গবেষণার সহ-লেখক ও উইসকনসিন ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ডাটন বলেন, ‘অতীতের উষ্ণ সময় থেকে পাওয়া প্রমাণে দেখা যায়, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা হলে কয়েক মিটার বা তারও বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এবং এই উষ্ণতা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বরফ গলা ও সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি ততই বেশি হবে।’
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জোনাথন ব্যাম্বার বলেন, ‘গত কয়েক দশকে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা বরফক্ষয়ের তথ্য আমাদের — বৈজ্ঞানিক ও নীতিনির্ধারক উভয়ের জন্য — একটি বিরাট সতর্ক সংকেত। মডেলগুলো এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, যেমনটা আমরা বাস্তবে দেখেছি।’
ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক রব ডেকনটো বলেন, ‘এই পরিবর্তনগুলো বহু প্রজন্মের জন্য স্থায়ী হতে পারে — এমনকি পৃথিবী যদি প্রাক-শিল্প তাপমাত্রায় ফিরেও যায়, বরফ চাদর পুনরুদ্ধারে শত শত বছর লাগতে পারে। অতিরিক্ত বরফ হারিয়ে গেলে, কিছু অংশ হয়তো পুনরুদ্ধারই হবে না — যতক্ষণ না পৃথিবী আবার কোনো বরফ যুগে প্রবেশ করে।’