মানুষের জীবন চিরদিন এক রকম থাকে না। কখনো সুখ, কখনো দুঃখ, কখনো প্রাচুর্য, কখনো অভাব, এই ওঠানামার মধ্য দিয়েই চলে মানবজীবনের যাত্রা। জীবনযাত্রার এই পটভূমিতে একদিকে যেমন মানুষ ভোগ-বিলাসের পেছনে ছুটে চলে, অন্যদিকে তেমনি অনেকেই আর্থিক অনটন, ঋণ এবং অনিশ্চয়তার করাল গ্রাসে পড়ে হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষায় বলা হয়েছে, জীবনের এমন সংকটময় মুহূর্তেও আশাহত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। বরং আল্লাহতায়ালার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে কিছু নির্দিষ্ট আমল ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করলে সেই সংকট কেটে যেতে পারে এবং এতে রিজিকে বরকত আসে, অন্তরে শান্তি নেমে আসে। দান-সদকা তেমনই এক আমল।
এক যুবক জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে যায়। মাস শেষে বেতন ফুরিয়ে যেত, দিন দিন ঋণের বোঝা বেড়েই চলছিল। ফলে শান্তি যেন হারিয়ে গিয়েছিল তার জীবন থেকে। একদিন এক বন্ধুর কাছে বিষয়টি নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করলেন। পুরো ঘটনা শুনে বন্ধুটি তাকে বলে, ‘তুমি তোমার বেতন থেকে নিয়মিত কিছু দান-সদকা করো।’
তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি তো ঋণের ভারে ডুবে আছি, দান-সদকা করব কীভাবে?’ বন্ধুটি বললেন, ‘সদকা করো, দেখবে আল্লাহতায়ালা তোমার জন্য রিজিকের নতুন দুয়ার খুলে দেবেন!’ বন্ধুর কথা শুনে স্ত্রীও উৎসাহ দিলেন, তাই তিনি বেতনের কিছু অংশ সদকা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সুবহানাল্লাহ। কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবন বদলে যেতে লাগল! ঋণের বোঝা থাকলেও মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। যেখানে আগে মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা ফুরিয়ে যেত, সেখানে বরকত দেখা দিল। ধীরে ধীরে নতুন উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হলো।
নতুন উপার্জনের অর্থ পেলেই তিনি কিছু অর্থ নিয়মিত দান-সদকা করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি সদকা তার রিজিকের নতুন নতুন দরজা খুলে দিচ্ছিল!
অনেকের মনে হতে পারে, এটা গল্প। কিন্তু না, কোরআন মাজিদ বলছে, দান-সদকা অভাব দূর করে। সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা ২৬১) হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হালাল কামাই থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সদকা করবে (আল্লাহ তা কবুল করবেন) এবং আল্লাহ শুধু পবিত্র মাল কবুল করেন আর আল্লাহ তার ডান হাত দিয়ে তা কবুল করেন। এরপর আল্লাহ দাতার কল্যাণার্থে তা প্রতিপালন করেন; যেমন তোমাদের কেউ অশ্ব শাবক প্রতিপালন করে থাকে, অবশেষে সেই সদকা পাহাড় বরাবর হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি)
আলেমরা দান-সদকার উপকারিতার বিষয়ে বলেন, তা জান্নাতের দরজা খুলে দেয়। মানুষের গুনাহ মোচন করে ও পাপের কাফফারা হয়। কেয়ামতের দিন সদকা তার দাতার জন্য ছায়া হবে। সদকার মাধ্যমে বিপদ-আপদ দূর হয়, এটা বালা-মসিবত রোধ করে। সদকা রিজিক বাড়ায় ও জীবনে বরকত নিয়ে আসে। সদকা মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তকে সহজ করে দেয়। সদকা কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেয়। সদকা বরকতময় জীবনের চাবিকাঠি। আপনি যদি কাউকে সদকার পরামর্শ দেন এবং সে তা অনুসরণ করে, তবে তার সদকার সমপরিমাণ সওয়াব আপনিও পাবেন! এমনকি আপনি দুনিয়া ছেড়ে গেলেও যে পর্যন্ত মানুষ আপনার কারণে সদকা করবে, আপনি ততদিন সওয়াব পেতে থাকবেন!
আয় যত কমই হোক, সামান্য হলেও দান-সদকা করুন। কারণ, দান-সদকা আল্লাহর হাতে পৌঁছায় আগে, তারপর গরিবের হাতে যায়। যদি সত্যিই জীবনে বরকত চান, তাহলে আজ থেকেই দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তুলুন!