ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন হুমকিতে পরিবেশ

শিল্পায়ন, যা একসময় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন তা অপ্রতিরোধ্য শক্তি। কিন্তু প্রকৃতি থেকে এমনভাবে সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, যা টেকসই তো নয়ই বরঞ্চ ক্ষতিকর। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকীকরণের দিকে যাত্রা শুরু করা ডিজিটাল বাংলাদেশ, আজ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ অনুভব করতে শুরু করেছে। এক সময় যে নদী বিশুদ্ধভাবে প্রবাহিত হতো, সেগুলো শিল্পবর্জ্যে ছেয়ে গেছে; এক সময় যে বনভূমি বৃক্ষমালায় সমৃদ্ধ ছিল, সেগুলো কারখানা তৈরিতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যে বাতাসের মাধ্যমে আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিই, তা শুধু শিল্প নির্গমনের ভার বহন করে চলছে! প্রশ্ন হচ্ছে: এই চাপ অনুভূত হচ্ছে কি না তা নয়; বরঞ্চ প্রশ্ন এটা হওয়া উচিত, আমাদের সুশৃঙ্খল বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি ধাপ ধসে পড়ার আগে কতক্ষণ তা সহ্য করতে পারবে? বাংলাদেশের দ্রুত শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি, ‘টেক্সটাইল শিল্প’; এবং এটি পানির বৃহত্তম গ্রাহকদের মধ্যে একটি, মাত্র এক কেজি কাপড় উৎপাদনের জন্য ৩০,০০০ লিটারেরও বেশি পানি প্রয়োজন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা; নির্মাণকাজের জন্য খনিজ পদার্থের ক্রমবর্ধমান উত্তোলন এবং কারখানা ও রাস্তাঘাটের জন্য অনিয়ন্ত্রিত বন উজাড় বেড়ে চলছে।

এই শিল্পগুলো চাহিদার চেয়েও বেশি পূরণ করছে এবং ফলে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ এখন আর দূরবর্তী হুমকি নয়; এটি সবার কাছে দৃশ্যমান। বুড়িগঙ্গার মতো নদীগুলো দূষণকারী পদার্থে ভরা এবং প্রধান শহরগুলোর বায়ু, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিতগুলোর মধ্যে একটি। কৃষি ও পানীয় জলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, যার ফলে ঢাকার মতো শহরগুলোতে, যেখানে বিশুদ্ধ জলের অভাব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে শিগগিরই আমরা বাস্তুতন্ত্রের অপরিবর্তনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি; যার পরিণতি কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, অস্থিতিশীল শিল্প অনুশীলন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রতিনিয়ত তীব্র করে তুলছে। যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত স্বাস্থ্যের চেয়ে মুনাফাকে বেছে নিচ্ছে। অন্যদিকে, দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শোধন ব্যবস্থার অভাব সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ এমন হারে হ্রাস পাচ্ছে, যা একসময় চাহিদা অনুযায়ী টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এক সময়ের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত বনভূমি এবং বৃক্ষরাজি, বর্তমানে শিল্প উন্নয়নের উদ্দেশ্যে জমিতে রূপান্তরের কারণে নাটকীয়ভাবে সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর অবক্ষয় কেবল বনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; জীবাশ্ম জ্বালানি মজুদ থেকে শুরু করে জল সরবরাহ এবং উর্বর জমি পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা ছাড়াই এটি নিষ্কাশিত হচ্ছে। হাজারীবাগের ট্যানারি এবং চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙার কারখানার মতো শিল্পের দূষণ মাটি, পানি এবং বায়ুকে প্রতিনিয়তই দূষিত করে চলেছে। এই পদক্ষেপগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল পরিবেশের আকারে অনুভূত হচ্ছে। তথ্যগুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে আগেই।  এক সময়ের উর্বর সমভূমি এবং সবুজ ক্ষেতগুলো আজ শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে এবং নগরায়ণের অপরিকল্পিত বিস্তৃতি কৃষিজমিকে গ্রাস করে যাচ্ছে। এছাড়াও, পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই শিল্পগুলো যত প্রসারিত হচ্ছে, নেতিবাচক প্রভাবগুলো সুদূরপ্রসারী। উদ্বেগের বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে টেকসই উন্নয়নের চেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক লাভকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য আশঙ্কাজনক হারে ধ্বংস হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতি কেবল বন্যপ্রাণীকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরঞ্চ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকেও ব্যাহত করছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির প্রভাব গভীর; যা খাদ্য উৎস, জীবিকা এবং এমনকি স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রতিনিয়ত বিরূপভাবে প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের নির্ধারিত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখনো আইন প্রয়োগে খুবই দুর্বল, যার ফলে শিল্পগুলো পরিবেশগত আইন অনুশীলন ও পালনে ভীতিহীনভাবে এবং খুব সহজেই লঙ্ঘন করতে পারছে; যার ফলে তাদের কোনোপ্রকার শাস্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। নির্গমন এবং বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে টেকসই নিয়মকানুন থাকলেও, প্রায়শই এগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত ও তদারকি হচ্ছে না।  এই ব্যর্থতা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে শিল্পগুলো কোনো প্রকার দায়মুক্তি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে পরিবেশগত ক্ষতিসমূহ ইতিমধ্যেই সুস্পষ্ট এবং ভবিষ্যতের আগত ঝুঁকিগুলোও অত্যন্ত ভয়াবহ। তবুও, এখনো আশা রয়েছে। সরকার, শিল্প এবং নাগরিকরা যদি কাঁধে কাঁধ রেখে ও হাতে হাত মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ মতাদর্শ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে এই বাংলাদেশে এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব দুটো একই সুতোয় গেঁথে ক্রমবর্ধমান ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। আমাদের একমাত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য হলো, অবশ্যই সম্পদের দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধায়ক হয়ে টেকসই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে, একটি সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ।

লেখক : গবেষক ও মার্কেটিং কৌশলী

dauwoodibrahim722@gmail.com