মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্যক্তির অপরাধ প্রবণতার জন্য সামাজিকভাবে উদ্ভূত কিছু বিষয়ের উপাদানগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। যখন সামাজিক ভারসাম্য ভূলুণ্ঠিত হয়, সমাজে অপরাধীর সংখ্যা তখন বাড়ে। এর ফলে সামাজিক কিছু কার্যকলাপের ভিত্তিতে মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। এমন কিছু উপাদান হলো : ঈর্ষাপরায়ণতা, হীনমন্যতা, হতাশা, স্বার্থ এবং আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং দুর্বল মন। এর বাইরে মূল যে বিষয়টি ভয়াবহভাবে কাজ করে, তা হচ্ছে বৈষম্য। যে মানুষের মধ্যে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে প্রকট সমস্যা, তাকে যে কোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়। কারণ একজন মানুষকে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে, তাকে আর্থিক সংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। সেটা যে উপায়েই হোক। এর বাইরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে যদি আইনশৃঙ্খলা অবনতির চেষ্টা করা হয়, তাকে দমন করার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু যখন খোদ সিস্টেমের সমস্যা থাকে, তখন কোনো কর্তৃপক্ষই সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না। তাহলে সমাধান কী? সমাধান একটাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতৈক্য থাকতে হবে। তখনই পরিস্থিতি স্থিতিশীল সম্ভব।
দেশে প্রকাশ্যে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ফলে দেশ জুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে গভীর রাতে রাজপথে অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ে। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে রয়েছে সরকার। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, রাজধানীসহ দেশব্যাপী খুন-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা নাগরিকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর সারা দেশে ক্রমানুসারে বেড়ে চলছিল এই অপরাধমূলক কর্মকা-। পরে যৌথবাহিনীর অভিযান ‘ডেভিল হান্ট’সহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলে অপরাধ কর্মকা- কিছুটা কমে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ঢিলেমি দেখা দিলে আবারও বাড়তে থাকে একই ধরনের অপরাধ। প্রায়ই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সশস্ত্র মহড়া চালায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কেউ কথা না শুনলে হুমকি, অস্ত্র দেখিয়ে শাসানো, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খুন, চাঁদাবাজি দ্বন্দ্বে হত্যা, প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ছিনতাই ও খুনসহ এখন আবার বেড়েছে অপরাধমূলক কর্মকা-। দায়িত্ব নেওয়া কর্মকর্তারা বিগত সরকারের আমলে ‘অপারেশনাল’ কার্যক্রমের বাইরে ছিলেন। ফলে এলাকাভিত্তিক অপরাধী, অপরাধীদের ধরন এবং অপরাধ প্রতিরোধের পদক্ষেপের ব্যাপারে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে পুলিশের একটি অংশ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে। ফলে পুলিশি কার্যক্রমে গতি কিছুটা বাড়লেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। যার প্রভাব পড়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।
মহাসড়কে বাসের ভেতরে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ। মধ্যরাতে ব্যবসায়ীকে গুলি করে সোনাদানা ছিনতাই। দিনদুপুরে খোদ রাজধানীতে চলন্ত বাসে অস্ত্র ঠেকিয়ে লুটতরাজ। প্রান্তিক জনপদে ট্রিপল মার্ডার। বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর গ্যাং। পুলিশের বিশেষ তৎপরতা থাকলেও, খুনোখুনি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, মব ভায়োলেন্স এমন কোনো অপরাধ নেই, যা ঘটছে না। পুলিশ বলছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানম-ি ও হাজারীবাগ এলাকার অপরাধীদের বড় অংশের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এদের অনেকেই সাম্প্রতিককালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশের এলাকায় পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বেশি। আবার উত্তরার দিকে অল্পবয়সীদের অপরাধ-চক্রের তৎপরতা লক্ষণীয়। খিলগাঁও, মগবাজার, বাড্ডা ও মহাখালী এলাকায় পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি মৌসুমি অপরাধীদের তৎপরতা পেয়েছে পুলিশ। এই অবস্থায় শুধু পুলিশের কাঁধে দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কী করলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আসবে, সরকারকে দ্রুত সেই উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এই রকম অস্থিতিশীল পরিবেশে, বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুবই কম। যার মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতিতে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে, মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে।