কর্মীদের রোষে ১০০ নেতা

‘বাগে পেলে মারব তারে’ আবহমান বাংলার এ বাগধারা হয়তো আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষোভের ভাষা। ক্ষমতা যখন হাতিয়ার তখন পতন হলো তার শেষ পরিণতি। পতিত আওয়ামী লীগের ‘ক্ষমতার দাপটে’ দেশের মানুষ ছিল জর্জরিত। দলটির নেতারা করেছেন যা-তা। আর কর্মী-সমর্থকরা তখনো বঞ্চিত, এখনো আক্রান্ত। তবে অন্য কেউ নয়; আওয়ামী লীগের ১০০ নেতাকে খুঁজছেন খোদ দলটির কর্মী-সমর্থকরাই।

তারা বলছেন, দলকে স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদী তকমা নিতে হয়েছে ওই ১০০ নেতার কারণে। দুর্নীতি-লুটপাট, পদ ও মনোনয়ন-বাণিজ্য এবং স্বেচ্ছাচারী রাজনীতির জন্য দলটি খাদের কিনারে। এখন ওইসব নেতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কর্মী-সমর্থকরা কড়ায়-গ-ায় হিসাব বুঝে নিতে চান। শুধু তাই নয়, ওইসব নেতাকে লাঞ্ছিত করার রোষে আক্রোশে রয়েছেন তারা। কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, দল ও সরকারকে ডোবানোর কারিগর মূলত ১০০ নেতা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের রাম-রাজত্বের রাজনীতিও দলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ বিচারের মুখে। সন্ত্রাসী আইনে দলের কার্যক্রমও এখন নিষিদ্ধ।

কার্যক্রমহারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ৩৫০ যোগাযোগমাধ্যম খুলেছেন। এর মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইমো, টেলিগ্রাম, সিগন্যালও রয়েছে। এসব যোগাযোগমাধ্যমে চিহ্নিত ওই ১০০ নেতার নামের তালিকা ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব গ্রুপে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও যুক্ত রয়েছেন।

১০০ নেতার বিরুদ্ধে থাকার পেছনে মূলত যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন কর্মী-সমর্থকরা। তার মধ্যে রয়েছে আর্থিক লেনদেনে দলীয় পদ বিক্রি করা, কর্মী-সমর্থকদের মূল্যায়ন না করা, টাকার বিনিময়ে বিএনপি-জামায়াতের অনুসারীদের দলে ভেড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরিতে সুযোগ করে দেওয়া। সম্মেলন বাদ দিয়ে প্রেস রিলিজনির্ভর কমিটি দেওয়া। বেফাঁস কথা বলা।

গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের করুণ পরিণতির মূল কারণ নিয়ে অনুসন্ধান করেন দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের ২৫টি জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে তার কথা হয়। তারা কেউ ক্ষমতার আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতি করার সুযোগ পাননি। অথচ ‘কিছু না করে’, ‘না পেয়ে’ কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়াচ্ছেন।

এ ছাড়া ৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুরবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আইনজীবী, চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, দিনমজুর এমনকি বেকার জীবন কাটাচ্ছেন এমন লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারাও কর্মী-সমর্থকদের মতো দলটির দোষত্রুটি নিয়ে ক্ষুব্ধ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে দেড় যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। কর্মী-সমর্থক বলছেন, আওয়ামী লীগকে এ পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে এমন ১০০ নেতাকে তারা চিহ্নিত করেছেন। যার মধ্যে রয়েছেন দেড় ডজন কেন্দ্রীয় নেতার নাম।

চিহ্নিত ১০০ নেতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের। কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে অজনপ্রিয় কাদেরকে তিনবার দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে দলকে ৫ আগস্টের মতো পরিস্থিতি বরণ করতে হয়েছে। কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, দুর্নীতি-লুটপাট, পদবাণিজ্য, মনোনয়নবাণিজ্য, সিন্ডিকেটনির্ভর রাজনীতি, বেসামাল বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মী-সমর্থকদের দূরে সরিয়ে রাখার তুঘলকি রাজনীতি করে ৭৬ বছরের পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছেন ওবায়দুল কাদের।

যদিও কলকাতা থেকে পরিচালিত ‘দ্য ওয়াল’ নামে একটি সাইটে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। সেখানে তিনি নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, ‘আমি চাঁদা খাইনি, পদবাণিজ্য করিনি, কমিশন নিইনি।’ ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রথম মুখ খুললেন কাদের, যা সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

তালিকার শুরুর দিকে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। পরিবারের প্রভাব খাটিয়ে দল ও সরকারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন এ প্রভাবশালী নেতা। সরকারে না থাকলেও তার কথা শুনতে হয়েছে সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের। তালিকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আরও রয়েছেন আবদুর রাজ্জাক, নুরুল ইসলাম নাহিদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, হাছান মাহমুদ, দীপু মনি, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, আহমেদ হোসেন প্রমুখ।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ‘টাকার কাছে সব জায়েজ’ এমন রাজনীতি করেছেন। আমাদের অঞ্চলের মানুষ তাকে ‘বস্তা স্বপন’ বলেই বেশি চেনেন। দলের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেনকে কর্মী-সমর্থকরা চেনেন ‘এক হাতে টাকা আরেক হাতে পদ’ দেওয়া নেতা হিসেবে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনির বিরুদ্ধে অভিযোগ কর্মী-সমর্থকদের দূরে থাকতে মন্ত্রণালয়ে অফিস করতেন না তিনি। তার আপন ডাক্তার ভাইয়ের চোখে ভালোমন্দ বিচার করতেন ও রাজনীতি করতেন তিনি।

বিপ্লব বড়ুয়া, সেলিম মাহমুদ, আবদুস সোবহান গোলাপ সবসময় দলীয় প্রধানের আশপাশে থাকার সুযোগ পাওয়ায় ‘মুই কী হনুরে’ ভাব নিয়ে থাকতেন। ফলে মাঠের রাজনীতির করুণদশা টের পাননি শেখ হাসিনা।

কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন এএইচএন আশিকুর রহমান, বিএম মোজাম্মেল হক, ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ (পরিবার), সাখাওয়াত হোসেন শফিক ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত। কেন্দ্রীয় এসব নেতার বিরুদ্ধে পদ বিক্রি, দলীয় কর্মীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, সময় না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের।

কেন্দ্রীয় এসব অনেক নেতার বিরুদ্ধে কর্মী-সমর্থকদের জেল-জুলুম খাটিয়েছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। ক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকদের অভিযোগ, একসময় দলের ত্যাগী নেতাদের উপেক্ষা করে উল্টো বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থককে দলে ভিড়িয়েছেন। টাকার বিনিময়ে অন্য দলের নেতাকর্মীকে কাছে টেনে ব্যক্তিরাজনীতি শক্তিশালী করার অপরাজনীতি করেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় এসব নেতা অন্য দলের নেতাকে আওয়ামী লীগ সাজিয়ে মনোনয়ন বিক্রি করেছেন।

কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী ও এমপিরা দলে হাইব্রিড নেতা আমদানি শুরু করে। এরপর পদ-পদবি তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এখন ওইসব হাইব্রিড রপ্তানি হয়ে যার যার পুরনো জায়গায় চলে গেছেন। এ কাজগুলো বেশি করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারা।

একশর তালিকায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন নসরুল হামিদ বিপু, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জুনায়েদ আহমেদ পলক।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নওফেলের নাম দিয়েছেন ‘প্লিজ টেক্সট’। তাকে ফোন করলেই ফিরতি বার্তা পাওয়া যেত ‘প্লিজ টেক্সট’। ‘প্লিজ টেক্সট’ নিয়ে চট্টগ্রামের প্রায় সব নেতাই বিরক্ত। জাতীয় পর্যায়ের দলের অনেক নেতাও একই কারণে বিরক্ত।

সরকার পতনের পর পলক কারাগারে গেলেও কর্মী-সমর্থকের ক্ষোভ কমছে না। একইরকম ক্ষোভ দেখা গেছে ফরহাদ হোসেন, আনিসুল হক, তাজুল ইসলাম, মন্ত্রী পদমর্যাদার সালমান এফ রহমান, তারিক আহমেদ সিদ্দিকী (পরিবার), আসাদুজ্জামান খান কামাল, র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী, নাজমুল হাসান পাপন, মুহিবুর রহমান, টিপু মুনশি, স্বপন ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে।

এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সুযোগ না দিতে নানা টালবাহানা করলেও বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কাজকর্মে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সামনাসামনি হলে কর্মী-সমর্থকদের ‘হাইকোর্ট’ দেখাতেন তারা। বিপু ও পলকের বিএনপি-জামায়াত করা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য থাকা ও তাদের ঠিকাদারি ব্যবসায় সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়ার কথা শোনা যায়।

সংসদ সদস্যদের (এমপি) মধ্যে একশর তালিকায় রয়েছেন নিজাম উদ্দীন হাজারী, এনামুল হক শামীম, মাহাবুব আরা গিনি, শাহরিয়ার আলম, ডা. হাবিবে মিল্লাত, শামসুল হক টুকু, আলী আজগর, শফিকুল আজম, আ ফ ম রুহুল হক, জাহিদ ফারুক, রেজোয়ান আহমেদ তৌফিক, আফজাল হোসেন, জাহেদ মালেক স্বপন, মমতাজ বেগম, জাহিদ আহসান রাসেল, জিল্লুল হাকিম, উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, আবু জাহির, ইকবালুর রহিম, শফিকুল ইসলাম শিমুল, গোলাম ফারুক খোন্দকার প্রিন্স, শাহিন চাকলাদার, শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ তন্ময়, আবদুস সালাম মুর্শেদী, আ স ম ফিরোজ, নুরুন্নবী চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, হাসানাত আবদুল্লাহ, বজলুল হক হারুন, ছোট মনির, আহসানুল হক টিটু, ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, শামীম ওসমান, নূর-ই-আলম চৌধুরী, মুহিবুর রহমান মানিক, নুরুল ইসলাম নাহিদ, মামুনুর রশীদ কিরন, একরামুল করিম চৌধুরী, নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন, সাইমুম সরওয়ার কমল, বীর বাহাদুর উ শে শিং, নুরুল ইসলাম সুজন, আবদুল ওদুদ, ওমর ফারুক, চয়ন ইসলাম, মকবুল হোসেন, সোলেয়মান হক জোয়ার্দার ছেলুন, আলী আজগর, শেখ আফিল উদ্দিন, বিএম কবিরুল হক। আছেন শেখ পরিবারের একাধিক সদস্যও। কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নামও উঠে এসেছে এই তালিকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচার, রাজনীতি করতে না পারা, রাজনীতিতে সিন্ডিকেট সৃষ্টি করা ও চাকরিবাকরি পদ-পদবি বিক্রি করার মতো ঘোরতর অভিযোগ রয়েছে কর্মীদের। গত দেড় দশকের রাগ-ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে নেতাদের বিরুদ্ধে। সেসব নেতার সঙ্গে হিসাব মেলানোর অপেক্ষা করছেন দলের বিক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকরা।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, তাদের এমন আচরণ দলের অনুসারীরাই নয়, সেবা নিতে যাওয়া সাধারণ মানুষকেও বিরক্ত করতেন। সেসব কর্মী-সমর্থক দাবি করেন, সাংগঠনিক রীতিতে দল পরিচালনা না করে ব্যক্তি রীতিনীতিতে দল পরিচালনা করা হতো। এর মাশুল আর কেউ নয়, দলের কর্মী-সমর্থকরাই বুঝে নেবে।

এই একশ নেতাকে দেখামাত্রই শায়েস্তা করা হবে এমন ক্ষোভের কথা শুধু দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরাই বলছেন না, এই তালিকায় রয়েছেন প্রশাসন ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও। প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে সুযোগ পেলে আমার আক্রোশে পড়তে হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াকে। তাতে চাকরি থাকুক বা না থাকুক।’

আওয়ামী লীগের কর্মী শেরপুর নালিতাবাড়ী উপজেলার এক দিনমজুর (নাম প্রকাশ করা হলো না) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা আছে দরবেশ বাবাকে পেলে (সালমান এফ রহমান) মনে ঝাল মিটাতাম।’ যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, স্থানীয় সরকার মন্ত্রীসহ অন্তত ১০ জন আমার ক্ষোভ থেকে রেহাই পাবেন না। আর ওবায়দুল কাদের যেন দেশেই না ফিরতে পারে।’

শুধু নালিতাবাড়ী উপজেলার ওই দিনমজুর নন, কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, সালমান এফ রহমানের আধিপত্য দল ও সরকার দুটোকেই অন্তঃসারশূন্য করে তুলেছে। দল কাকে মনোনয়ন দেবে না দেবে সেটাও নির্ধারণ করতেন তিন। ফলে ফুলটাইম রাজনীতিবিদরাও এই দলে কোনো জায়গা পাননি। তার কারণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা নেতারা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল ভাবতেন না। টাকার মেশিন মনে করা শুরু করেন।

এ তালিকায় কমপক্ষে ২০ নেতা রয়েছেন কর্মী-সমর্থকদের ‘হিট লিস্টে’। এই ২০ নেতা সবার কাছে জাতীয় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কর্মীদের সামনে পড়ামাত্র জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো রাগ-ক্ষোভ ভেতরে পুশে রেখেছেন আওয়ামী লীগের লাখো কর্মী-সমর্থক। অনেকেই বলছেন, বিএনপি-জামায়াত বা ছাত্ররা কিছু না করলেও, তাদের ব্যাপারে আমাদের করণীয় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিচার্স ইনস্টিটিউশনে (সিআরআই) কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাজ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এমন একজন নারী শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের, হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপু মনি, আবদুস সোবহান গোলাপ, বিপ্লব বড়ুয়া, সেলিম মাহমুদ, নসরুল হামিদ বিপু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, নিক্সন চৌধুরী, শেখ তন্ময়, শেখ জুয়েল, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলে শামস পরশের দেখা পেলে হিসাব চুকিয়ে নেব।’

সিআরআইতে কাজ করে নিজের পারিশ্রমিক লোপাট করা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তন্ময়কে কখনো ক্ষমা করবেন না বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সমর্থক। তিনি বলেন, শেখ তন্ময় সিআরআইতে বসে লুটপাট করেছে। এদের কোনো ক্ষমা নেই।

ফেনী জেলার সাবেক যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন সদর আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দীন হাজারির অপকৌশল তুলে ধরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেনীতে গত ১৫ বছর শাসনেও ছিল বিএনপিও-জামায়াত নেতাকর্মীরা। আর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেনী ছাড়া থাকতে হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগের আরেক নেতা একরাম হোসেনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।’

সাখাওয়াত আরও বলেন, ‘গত ১৫ বছরে অসংখ্যবার আমার বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। শেষবার ২০২৪ সালের প্রথম দিকে যখন আবার বাড়ি পোড়ানো হয়, তখন আমার মা কষ্ট নিয়ে আমাকে অনুরোধ করেন, বাড়ি আর রিপেয়ারিং করিস না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়লে তারপর ঠিক করব।’ তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদেরের জন্য এ পরিণতির মুখোমুখি পড়তে হয়েছে আওয়ামী লীগকে।’

ঢাকার সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে নিয়ে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে থাকা এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপসের গোঁয়ার্তুমিতে দক্ষিণ আওয়ামী লীগের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। ঢাকার ওয়ার্ড কমিটি পর্যন্ত তার কনসার্ন লাগবে! কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কোনো ভূমিকা থাকত না।’

এ নেতা আরও বলেন, ‘ঢাকার রাজনীতি ধ্বংসের মূল কারণ তাপস ও তার আরেক ভাই যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ। পরিবার ও ব্যক্তিগত পছন্দের মোহে ঢাকার রাজনীতি দুর্বল হয়েছে। তাদের দুই ভাইয়ের প্রতি প্রায় সব কর্মী-সমর্থকের অভিযোগ আছে। সময়-সুযোগ পেলে দলের কর্মী-সমর্থকরাই হিসাব বুঝে নেবে।’

ছাত্রলীগের সাবেক স্কুলবিষয়ক সম্পাদক রাজেস চন্দ্র সিংহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শেষ কয়েক বছর সাংগঠনিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দলীয় প্রতীক দলকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রি হয়েছে মুড়ি-মুড়কির মতো। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। ছাত্রলীগেই ঘটেছে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ। পারিবারিক রাজনৈতিক আদর্শ যাচাই-বাছাই না করে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের রাগ-ক্ষোভ থাকতেই পারে। সব নেতা সব ঠিক করেছেন আবার সব খারাপ করেছেন এটা বলা যাবে না। ফলে কর্মী-সমর্থকদের নানান দুঃখ-কষ্ট থাকবেই। এগুলো ইতিবাচক হিসেবে দেখি আমরা।’