সারা দেশে প্রান্তিকপর্যায়ে বিদ্যুৎসেবা যারা দিচ্ছে, সেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অচলাবস্থা চলছেই। তাদের মধ্যে অসন্তোষ শুরু হয়েছে বিগত সরকারের সময়। তখন বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকলে আজ আন্দোলনের রেশ টানতে হতো না। যার জের টানতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একীভূতকরণ এবং চুক্তিভিত্তিক ও অনিয়মিত কর্মীদের চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন করেছে সমিতিগুলো। দেশে ৪ কোটি ৮২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক রয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লাখ। দেশ জুড়ে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে ভঙ্গুর বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা নির্মাণ করে গ্রাহক হয়রানি এবং গ্রাহক ও সমিতির লোকজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া, আরইবির ব্যর্থতার দায়ভার সমিতিগুলোর ওপর চাপানো, আর্থিক অনিয়ম, সমিতির কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি, জুলুম করা ইত্যাদি কারণে দীর্ঘকালের অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সমিতিগুলোয় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। দাবিগুলো ছিল বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া বৈষম্যের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপস্থাপন।
৩ মে ২০২৪ সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দুজন কর্মকর্তাকে আরইবিতে সংযুক্ত করা হয়েছিল এবং ৪ মে আরইবির পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম এসকান্দার আলীসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে অতর্কিত হাজির হয়ে কয়েকটি ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করে আরইবিতে নিয়ে আসেন। ৭ মে সমিতির আরও তিনজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে আরইবিতে সংযুক্ত করা হয়। ১০ মে কর্মসূচি চলাকালে বিদ্যুৎ বিভাগ, আরইবি এবং সমিতির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সভা হয়। বিতরণ কার্যক্রমের সঙ্গে অসম্পৃক্ত হওয়ায় আরইবির পলিসি গ্রাহকবান্ধব না হওয়া, নিম্নমানের মালামাল দিয়ে ভঙ্গুর বিতরণব্যবস্থা নির্মাণের কারণে গ্রাহক হয়রানি এবং সভার সিদ্ধান্ত না মেনে চালাকির আশ্রয় নেওয়াসহ সমিতির কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও হয়রানির প্রতিবাদে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং গ্রাহকসেবা সচল রেখে আবার কর্মবিরতি শুরু হয় ১ জুলাই ২০২৪। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ন্যায্য দাবির কথা বলতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৪০ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। ছয় হাজারের বেশি কর্মীকে নিজ এলাকা থেকে দূরের এলাকায় বদলি করেছে আরইবি। এ ছাড়া সমিতির অন্তত ১৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। যে কারণে তাদের মধ্যে রয়েছে চরম অসন্তোষ।
অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়ন, মামলা প্রত্যাহারসহ ৭ দফা দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির যৌক্তিক সংস্কার চাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কর্মচারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে আরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একীভূতকরণ বা অন্য বিতরণ সংস্থার মতো পুনর্গঠন, অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়ন, মিটার রিডার, লাইন শ্রমিক এবং পোষ্য কর্মীদের চাকরি স্থায়ীকরণ, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল, শাস্তিমূলক বদলি বাতিল, জনবলের ঘাটতি পূরণ এবং সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড গঠন। চলমান আন্দোলন নিয়ে মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে সংকট নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থে সমিতির কর্মীদের সভা-সমাবেশ থেকে বিরত থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের যাবতীয় সরঞ্জাম আরইবি কেনাকাটা করে। এতে অনেক সময় দুর্নীতির প্রশ্রয়ে নিম্নমানের জিনিসপত্র সরবরাহ করায় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় পল্লী বিদ্যুতে দায়িত্বরতদের। যেহেতু ঈদুল আজহার ছুটির আগেই কমিটি রিপোর্ট চূড়ান্ত করবে এবং এরপর সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, ফলে এখন আর আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।