সতের কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন বা কৃষির আধুনিকায়ন- কোনো কিছুতেই নতুন কোনো উদ্যোগ নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। গত আওয়ামী সরকারের সময় যে ব্যবস্থাপনা বা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চলছিল সেভাবেই চলবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সাহালউদ্দিন আহমেদ। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দেশে ১৭ কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার টেলিভিশনে দেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কৃষি ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু জাত ও উন্নততর চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সুলভ মূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সেচ এলাকা সম্প্রসারণ, বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যেগুলো ধারাবাহিকভাবে চলবে বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদেরকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ হতে সার আমদানি এবং দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদন বাবদ প্রয়োজনীয় ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। তবে এটা নতুন কিছু নয়। দেশের চাহিদার বেশিরভাগ সার আগেও আমদানি করা হতো- এখানে সেভাবেই আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, উৎপাদিত কৃষি পণ্যের অপচয় রোধ করাসহ সার্বিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্যাকেজিংসহ হিমাগার ও কোল্ড চেইন কাঠামো শক্তিশালীকরণ, কৃষি পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি পণ্যের সাপ্লাই চেইনের সকল অংশীজনের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইজ তৈরি করা, বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা, ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যেখানে কর্মকর্তা-যন্ত্র সরবরাহকারী মিলেমিশে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। তারপরও প্রকল্পটি সেভাবেই চলছে। সাত হাজার কোটি টাকার পার্টনার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি বিভাগ, কিন্তু প্রায় তিন বছর সময় ধরে এই প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতি ১০ শতাংশের আশপাশে। কিন্তু প্রকল্পগুলো স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে কৃষির আধুনিকায়ন ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করার জন্য কোন ঘোষণা নেই অর্থ উপদেষ্টার বাজেট বক্তৃতায়।
এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান উদ্যোগগুলো চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চলমান রয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ৯০১টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সারাদেশে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তালিকাভুক্ত চা বাগানের শ্রমিকদের মাঝে প্রতিকেজি ১৯ টাকা দরে গম বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া, ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট’ কর্মসূচির আওতায় ১০ লাখ ৪০ হাজার দুস্থ মহিলাকে মাসে ৩০ কেজি হারে চাল প্রদান করা হচ্ছে।
তবে আগামী অর্থবছরে খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা ৩৭ লাখ মে. টনে উন্নীতকরণ এবং খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ।
দেশের ক্রমবর্ধমান নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে মৎস্য এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির টেকসই জাত উন্নয়ন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৪ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ২য় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থানে রয়েছে। ভুলভাল উৎপাদনের তথ্য দিয়ে গত সরকারের সময়ে এই সংখ্যাগুলোকে একটা উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
সবগুলো উপখাত মিলে এবার কৃষিতে সামান্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩৮ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা।