ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যযুদ্ধ নির্ভরশীলতা কার?

বাংলাদেশ-ভারত একটি বন্ধুপ্রতিম, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও বর্তমানে একে অপরের ওপর পণ্য রপ্তানিসহ বন্দর ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্যে স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। গত পাঁচ আগস্ট ২০২৪ সালের পর দেশ দুটির মধ্যে প্রতিহিংসার মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারতের মিডিয়াগুলোর অতিরঞ্জিত মিথ্যাচার সংবাদ ও উদ্ভট আচরণের ফলে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে একটি ভালোবাসা ছিল, এখন সেই ভালোবাসায় চির ধরেছে। ফলে এক প্রকার আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ভারত হয়তো ভাবছে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে ভারতের প্রতি নির্ভরশীল। এ অন্ধবিশ্বাস থেকেই একের পর এক হেয়ালিপনার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে এবং ভাবছে এবার বাংলাদেশ তাদের কাছে নত শিকার করবে। কিন্তু ঘটে তার উল্টো। বরং বাংলাদেশও ভারতের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি এমন সাহস কেউ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের এমন দুঃসাহসের ফলে ভারত প্রতিহিংসার আগুনে জ¦লে পুড়ে ছারখার হচ্ছে। ভারতকেও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখন আর দুর্বল বা ছোট অর্থনীতির দেশ নয়। বাংলাদেশ এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করে, যা মোট জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।

বাংলাদেশও এখন বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। বাংলাদেশকে ছোট করে না দেখে, হাতে হাত রেখে, পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেই বরং উভয়ের জন্য মঙ্গল হতো। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার তথা বিশ্ব মোড়ল হতে চাইলে, ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশকে পাশে রাখতে হবে এবং তাদের অর্থনীতি অনেক বড় হলেও বাংলাদেশের ওপর অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বেশি নির্ভরশীল। অপরদিকে বাংলাদেশকেও অর্থনীতি মজবুত করতে হলে, অবশ্যই ভারতকে পাশে দরকার। কারণ ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বর এবং প্রায় নয়শ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি। অপরদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে ভারতের অবস্থান নবম স্থানে এবং প্রায় ১৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৩.৭৫ শতাংশ। ভারত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছে, এই দোহাই দিয়ে বারবার সুবিধা নিয়েছে। আরও একটি বিষয় হলো, ভারত অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সিদ্ধান্ত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশও উদারভাবে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তাদের মন রক্ষার চেষ্টা করেছে। ঠিক এর বিপরীত হলো, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এ কারণেই ভারতের মন খারাপ, সীমান্তে পুশইন থেকে শুরু করে হেন কাজ নেই তারা করছে না এবং বাণিজ্যে যুদ্ধের মতো ঘটনাও ঘটছে। ভারত গত ৯ এপ্রিল ২০২৫ থেকে কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিশে^র বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় বাংলাদেশের কাছ থেকে। যা হয়তো বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, বাংলাদেশ বাধ্য হয়েই তার বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে এবং বাংলাদেশও সেই চেষ্টাই করছে। অপরদিকে বাংলাদেশও ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ভারত থেকে স্থলপথে সুতাসহ ৩৩টি পণ্যের আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। আবার ভারত ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় গত ১৭ মে ২০২৫ তারিখে স্থলবন্দর ব্যবহার করে তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু পণ্যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, যা একটি স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নেয়। বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ।

বাংলাদেশের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ভারত নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যেই তারা প্রায় ২২ হাজার কোটি রুপি ব্যয় করে চিকেন-নেকের মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা তৈরি পরিকল্পনা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভারত হয়তো রাস্তা তৈরি করবে এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।  তাতে কি ভারতের পণ্য পরিবহন ব্যয় কমাতে পারবে? ভারত চেষ্টা করলে বিকল্প হয়তো রাস্তা তৈরি করতে পারবে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় চিন্তা করলে, তারা বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে না। বাংলাদেশ জন্মলগ্ন হতে শুরু করে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল, আজও তা বিদ্যমান থাকলেও তা অনেকাংশে কমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে খুব সহজেই ভারত নির্ভরশীলতা আরও কমবে। যা ভারত রপ্তানি বাণিজ্যে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব না পড়লেও তার দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে ভারতের উচিত, বাংলাদেশকে বন্ধু ভেবে বন্ধুর পাশে থাকা এবং বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতি আন্তরিক হওয়া।  কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের যেমন ভারতকে প্রয়োজন, ঠিক তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। তাই ব্যক্তি বিশেষ, কোনো গোষ্ঠী বা দলের প্রতি আন্তরিকতা নয়। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন না করলে, বাংলাদেশের জনসাধারণও ভারতের জনগণের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে। তবেই হবে সৌহার্দ্য ও সহযোগিতাপূর্ণ পারস্পরিক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র।

লেখক : ব্যাংকার ও লেখক

aktarrofikul@gmail.com