রাজনীতিতে যে অস্পষ্টতা, দ্বিধা ও উত্তেজনা জমে উঠছে, তা কেবল ঘটনার সমাহার নয়এ এক সময়চিত্র। আমাদের শাসনব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা দুর্বলতা, বৈপরীত্য ও অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। সরকার পরিবর্তনের প্রায় এক বছর হতে চলছে। অথচ একটি স্পষ্ট রূপরেখা, সময়সীমা কিংবা দায়িত্ববোধপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করতে পারেনি। বরং স্পষ্ট হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তা, দায়িত্বহীনতা ও অস্বচ্ছ চর্চার এক চিত্র। ঘটনাবলির পরম্পরা দেখে অনেকে বলছেন এটি একটি অদৃশ্য পরিকল্পনার অংশ, যার উদ্দেশ্য পানি ঘোলা করে কোনো পক্ষের স্বার্থসিদ্ধি। যে সরকারকে মনে করা হয়েছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী, সেই সরকার আজ ১০ মাস পূর্ণ হতে না হতেই দুর্বলতার লক্ষণ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে। নীতিগত স্পষ্টতা নেই, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছে।
দুই
মানুষ চেয়েছিল, একটি সুশাসনভিত্তিক প্রশাসন। যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবিকতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন ও গণতন্ত্রে ফেরার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও সময়সীমা। কিন্তু এর বদলে মানুষ দেখছে, ফেসবুক-ইউটিউব কেন্দ্রিক মবের শাসন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। যা আমাদের ভেতর নতুন ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। নানা গোষ্ঠী, নানা উদ্দেশ্যে, নানা যুক্তিতে দাবি তুলছে। সময় বেঁধে দিচ্ছে, আর সরকার সেই দাবি বাস্তবায়ন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই অদৃশ্য শক্তি কে?
তিন
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুদয়ের পেছনে যে বিশাল জনসমর্থন কাজ করেছিল, তা ইতিহাসে বিরল সম্মিলন। আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, দমন-পীড়ন, নির্বাচনব্যবস্থার ধ্বংস, বিচারহীনতা ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনতার বিদ্বেষ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, সব মত ও পথের মানুষ একটি পরিবর্তনের পক্ষে একত্র হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই গণদাবির বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সরকারের ভেতরে একটি অংশও যেহেতু দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকার পক্ষে, তাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল অংশী হিসেবে আমরা যাদের বিবেচনা করতে পারি, বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ঘোলাটে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার জন্য কোনো না কোনো পক্ষ যে ওঁৎ পেতে আছে, এমন শঙ্কার কথা বহুবার বলা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য যেমন প্রশ্ন তোলে, তেমনি রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও এক গভীর সংকেত। যখন শাসকগোষ্ঠীর ভিত্তি নিজের কাছেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এক ধরনের আদর্শশূন্যতার দিকে গড়ায়। বিএনপি এই সংকটে নিজেদের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান একটি সুস্পষ্ট দ্বন্দ্বে জর্জরিত।
চার
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০ মাস পর আমরা দেখছি, জনগণের প্রাথমিক প্রত্যাশা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা, স্পষ্ট সময়সীমার অভাব এবং জনসম্পৃক্ত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার ঘাটতি স্পষ্টতর হচ্ছে। মানুষের এমন প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছেএই সরকার কি আদৌ জানে, তারা কোথায় যাচ্ছে? একাধিক গোষ্ঠী এখন চায় সরকার তাদের দাবি মানুক চায়, তাদের ভাষ্যই হবে একমাত্র সত্য। এতে করে রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়ে উঠছে মব-নির্ভর। কিন্তু গণনির্ভর নয়। যারা ২০২৪ সালে রাস্তায় নামেনি, আন্দোলন করেনি, তারাই এখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে। আর যারা শহীদ হয়েছে, মামলা খেয়েছে, নিখোঁজ হয়েছে তাদের কণ্ঠ যেন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সরকার যদি জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিত, তবে দ্রুততম সময়ে একটি সুস্পষ্ট ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করত। একই সঙ্গে নির্বাচনের সময়সীমা, সংস্কারের ধাপ, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে আবশ্যক মনে করত। কিন্তু সেই সাহসিকতা তারা দেখায়নি। বরং ত্রিশঙ্কু কৌশলে নিজেদের বিতর্কিত করেছে। এখন আমরা দেখছি, বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন সময়সীমা বলছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর, কেউ বা বলছে ২০২৬ সালের জুন। আর সবচেয়ে বড় দল বিএনপি বলছে, এই ‘খোলা সময়সীমা’ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন চায়। অন্যদিকে, এনসিপি বলছে নির্বাচনের আগে যদি সংস্কার না হয়, তবে এই প্রক্রিয়া অর্থহীন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে, পুরনো সংস্কারের ভিত্তিতে নির্বাচন অর্থহীন হবে। নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সীমা, টার্গেট ও স্পষ্ট রাজনৈতিক চুক্তি ছাড়া দেশ এগোতে পারবে না।
পাঁচ
এই সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং গঠনমূলক আত্মবিশ্লেষণ। অথচ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব প্রকাশ্যে ‘রাজনৈতিক’ মন্তব্য করছেন। তিনি ‘বনসাই বাম’ বলে একটি গোটা রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ইতিহাসকে তাচ্ছিল্য করেছেন, যেটি শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের পরিপন্থী। প্রশ্ন উঠছে প্রেস সচিব কি আদৌ রাজনৈতিক বিশ্লেষক? তিনি কি কোনো দলের মুখপাত্র? নাকি একজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, যার দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য ও সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া, তদারকি করা এবং সরকারি তথ্য পরিবেশন? যখন এই ভূমিকায় থাকা ব্যক্তি বিরোধী মতের বিরুদ্ধে অবজ্ঞাসূচক শব্দ ব্যবহার করেন, তখন সেটি রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের ‘অঘোষিত পক্ষপাত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। প্রেস সচিবের এই বক্তব্য, যা প্রকৃতপক্ষে একটি দলীয় চিন্তার প্রতিধ্বনি, তা এই সরকারের গঠনমূলক অংশ নয়, বরং ক্ষতিকর উপসর্গ। এটি প্রমাণ করে, এই সরকার অভ্যন্তরীণভাবে কতটা আতঙ্কিত, বিভ্রান্ত এবং আত্মসমালোচনায় অনিচ্ছুক। ‘বনসাই’ শব্দটি ব্যবহারে যে কৌশলী অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে, তা রাষ্ট্রশক্তির একটি অভ্যন্তরীণ দম্ভকে উন্মোচন করে। বনসাই হয় কৃত্রিমভাবে কাটা-ছেঁড়া গাছ, যাতে সে বড় হতে না পারে। অথচ এ দেশের বামপন্থি রাজনীতি যদি আজ ছোট বা সীমিত হয়ে থাকে, তার দায় কি রাষ্ট্রের নয়? কিংবা রাষ্ট্র নিজেই দিন দিন বনসাইয়ে রূপ নিচ্ছে না তো? প্রতিটি সামরিক ও আধা-সামরিক সরকারের অধীনে যেভাবে বামপন্থিদের দমন করা হয়েছে, নিষিদ্ধ করা হয়েছে, জনবিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, আজও গণমাধ্যমে যেভাবে বাম রাজনীতিকে প্রান্তিক করে রাখা হয়। তা বনসাই করারই ধারাবাহিকতা। এখানে একটি ঐতিহাসিক সত্য আমাদের স্মরণ করা জরুরি এ দেশের প্রতিটি শাসকগোষ্ঠী, বামপন্থিদের তুচ্ছ করে এসেছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে উপেক্ষিত, নিগৃহীত এই বামপন্থি দলগুলোই দেশের মাটি থেকে উঠে আসা সংগ্রামী রাজনীতির ধারক। এ বাম ধারাই আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকেছে ভাষা আন্দোলনে, স্বাধিকার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, কর্মসংস্থান আন্দোলন এবং শ্রমিকের মজুরি আন্দোলনে। যে শক্তিকে বারবার ‘অসম্ভব’ বলা হয়েছে, সময়ই তাকে করেছে ইতিহাসের মহান চালক। আর যারা বাম রাজনীতিকে অবজ্ঞা করে ইতিহাসে তাদের স্থান কোথায় থাকবে, তা সময় নিখুঁতভাবে বলে দেবে। আজ যখন তারা শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, দমননীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন তাদের ‘বনসাই বাম’ বলে তাচ্ছিল্য করা হয়। এই অবজ্ঞার ভাষা একটি গভীর রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ।
ছয়
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো নির্বাচনের সময়সীমা ও কাঠামো চূড়ান্ত করা, যাতে সব দল এতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়। সংস্কারপন্থি ও প্রতিশ্রুতিশীল রাজনৈতিক শক্তির নিরাপদ রাজনৈতিক মাঠ তৈরি, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অর্থবহ হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, যাতে মব চাপ নয়, নীতিগত দায়িত্ব ও জবাবদিহিই হয় প্রশাসনের ভিত্তি। সরকার যদি এসব বিষয়ে সাহসিকতা ও স্বচ্ছতা দেখায়, তবে এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। না হলে এই ধোঁয়াশা ও দ্বিধার আবর্ত আমাদের নিয়ে যাবে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে যেখানে আবার পুরনো ভূত জেগে উঠবে। বাংলাদেশ একটি কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সম্ভাবনার পথ, আবার পাশে প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের আভাস। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সরকার, বিরোধী দল এবং জনগণের পারস্পরিক বোঝাপড়া, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্মত্যাগের ওপর। এখনই সময় আশা ও প্রজ্ঞার মধ্যে পথ খোঁজার। তাতে দেরি হলে, ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
লেখক: কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন