বহুতল ভবনে লিফটের ব্যবহার নিয়ে চলছে নানামুখী প্রতারণা। স্বনামধন্য লিফট কোম্পানির নাম, লোগো ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে। এতে ঠকছেন ক্রেতা, বাড়ছে লিফট দুর্ঘটনা ও মৃত্যুঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানী ঢাকায় বহুতল ভবনে গত কয়েকবছরে লিফট দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ নকল সরঞ্জাম সম্পন্ন লিফটের ব্যবহার। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনজীবন।
গত ২৭ মে ঢাকার কারওয়ান বাজারে ১৮ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ভবনের লিফট ছিঁড়ে, ৯ জনের মত আহত হন। আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত লিফট কোম্পানি ‘সিগমা’ র নাম ও লোগো ব্যবহার হচ্ছে যেনতেনভাবে। আর নিম্নমানের লিফট কিনে ক্রেতারা ঠকছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ‘ওটিস এলিভেটর কোম্পানি’র অনুমোদিত ব্র্যান্ড সিগমা। ২০১৮ সাল থেকে দেশে এর একমাত্র অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর ‘খান ব্রাদার্স ইক্যুবিল্ড লিমিটেড।’ বিশ্বে সর্বোচ্চ সংখ্যক লিফট সরবরাহের স্বীকৃতি হিসেবে সিগমা ব্র্যান্ড গত অর্থ বছরে সিগমা এলিভেটর কোং দক্ষিণ কোরিয়া কর্তৃক স্বর্ণপদক লাভ করে। কিছুদিন আগে এই কোম্পানির পক্ষ থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে জানানো হয়, সিগমা নাম ব্যবহার করে একাধিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীনভাবে তাদের লোগো ব্যবহার করে নকল লিফট সরবরাহ করছে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা সরকারি কোনও কর্তৃপক্ষ নেয়নি।
খান ব্রাদার্স ইক্যুবিল্ডের কর্মকর্তারা জানান, প্রতারক চক্র লিফটের দামি যন্ত্রাংশ পাল্টিয়ে নিম্নমানের মোটর, কন্ট্রোলার, ডোর ড্রাইভ, এসএস সিট ব্যবহার করে লিফট তৈরি করে বাজারে সরবরাহ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসাধু কিছু প্রতিষ্ঠান চায়না থেকে, কেউ আবার দেশের ওয়ার্কশপে এসব যন্ত্রাংশ তৈরি করে, পরে লিফটের বোর্ডে শুধু সিগমা লিখে আসল লিফট বলে চালিয়ে দেয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অনেক ভবন মালিক সরল বিশ্বাসে নকল লিফটকে আসল মনে করে কিনে নিয়ে বিপাকে পড়েন। এতে করে আর্থিকভাবে যেমন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে সাধারণের মৃতুঝুঁকি।
খান ব্রাদার্স ইক্যুবিল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খান বলেন, কোরিয়ান লিফট কোম্পানি সিগমার একমাত্র অথরাইজ ডিলার আমরা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ডিলার না হলেও চায়না থেকে নিম্নমানের পার্টস এনে ক্লোন করে সিগমা ব্রান্ডের সিল মেরে সরবরাহ করছে। এসব ক্লোন লিফট ব্যবহার করার কারণে মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। বিশেষ করে অখ্যাত কিছু ডেভেলপার কোম্পানি খরচ কমানোর জন্য নিম্নমানের ক্লোন করা সিগমা লিফট ব্যবহার করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা করুন। অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুক। বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভালো কাজ করছে। এক্ষেত্রেও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশা করি।
তিনি বলেন, বর্তমানে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায়। সরকার জনগণের মানমাল রক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরবেন বলে আশা করছি।
সিগমা নাম ব্যবহার করে নকল লিফটের ব্যবসা করে আসছে এমন বেশকিছু কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মালিবাগের বাংলাদেশ বিল্ডিং অটোমেশন, দক্ষিণখানের সিগমা এলিভেটর বাংলাদেশ লিমিটেড, কারওয়ান বাজারের সিগমা লিফট লিমিটেড, মগবাজারের ক্রেস্ট লিফটস লিমিটেড, নামাপাড়ার সিটি পাওয়ার লিফট, মিরপুরের সিগমা লিফট বিডি, সিগমা লিফট সাংহাই, অনলাইন ভিত্তিক মহাখালীর আজিজ লিফট টেকনোলজি লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। এদিকে লিফট নকল করা নিয়ে পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভোক্তা অধিদপ্তর গত ১১ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে ২৩ ফেব্রুয়ারি কাওরানবাজারে অধিদপ্তরের অফিসে হাজির হয়ে জবাব দিতে নির্দেশ দেয়। তবে, সেদিন তলবকারী কর্মকর্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম নিজেই অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।