পবিত্র ঈদুল আজহার সময় দেশে সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এই মৌসুমে সারা বছরের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ চামড়া আসে বাজারে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। চলতি বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার হলেও প্রস্তুত আছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি গরু-ছাগল। লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের।
তবে প্রতিবছরের মতো এবারও একটি বড় শঙ্কা ঘুরে বেড়াচ্ছে—চামড়া বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া। লবণ না দেওয়ায় সংরক্ষণের অভাব, অসতর্কতায় কাটা চামড়া, সময়মতো বিক্রি না করতে পারা—এসব মিলিয়ে আগেও দেশে চামড়া নষ্ট হওয়া কিংবা পানির দামে বিক্রি হওয়ার দৃষ্টান্ত বহুবার দেখা গেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) জানায়, গত বছর ঈদের প্রথম দুই দিনেই সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছিল; যার বেশির ভাগই ছিল খাসি ও বকরির।
দাম নির্ধারণ: ঢাকায় সর্বনিম্ন ১,৩৫০ টাকা, বাইরে ১,১৫০ টাকা
চলতি বছর ঢাকার মধ্যে লবণযুক্ত চামড়ার সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে এ দাম ১ হাজার ১৫০ টাকা। আকার বড় হলে দামও বাড়বে। তবে লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়ার নির্দিষ্ট দাম নেই। সেক্ষেত্রে বিক্রেতা-ক্রেতা দরাদরি করেই চূড়ান্ত করেন মূল্য।
ভালো দাম পেতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চামড়া ছাড়ানো এবং সংরক্ষণের শুরুতেই সচেতনতা জরুরি। পশুর গা থেকে চামড়া ছাড়ানোর সময় অসতর্কভাবে কাটাকাটি হলে সেটি নষ্ট হয়ে যায় বা দাম কমে যায়। চামড়া ছাড়ানোর ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যেই তাতে লবণ দেওয়া জরুরি। কেউ চাইলে নিজেই লবণ দিতে পারেন, এতে কয়েক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে ভালো দর পাওয়া সম্ভব।
লবণ কীভাবে দেবেন?
– চামড়ার গায়ে কোনো মাংস থেকে থাকলে তা আগে সরিয়ে নিতে হবে।
– ছায়াযুক্ত স্থানে (যেমন গাছতলা, গ্যারেজ, প্যান্ডেল) চামড়ায় মোটা দানার লবণ দিন।
– চড়া রোদ কিংবা বৃষ্টি—দুটোই চামড়ার জন্য ক্ষতিকর।
কতটা লবণ লাগবে?
চামড়ার আকার অনুযায়ী দরকার হবে:-
বড় (৩৫–৫০ বর্গফুট): ৮–৯ কেজি
মাঝারি (২০–২৫ বর্গফুট): ৫–৬ কেজি
ছোট (১৫–১৬ বর্গফুট): ৩–৪ কেজি
ছাগল-ভেড়া: এক কেজি লবণে সংরক্ষণ করা যায় ২টির বেশি
এ বছর ৭৪ কেজির বড় লবণের বস্তার দাম ১ হাজার ৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজি ১৮ টাকার আশপাশে। ফলে বড় একটি চামড়ার জন্য লবণের খরচ পড়বে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা।
একটি উদাহরণ দিই: ঢাকায় ১ লাখ টাকার একটি গরুর চামড়া যদি হয় ২০ বর্গফুট, তাতে লবণ দিলে দাম পাওয়া যাবে ১ হাজার ২০০ টাকা। কাঁচা অবস্থায় বিক্রি করলে কমে যাবে কয়েক শ টাকা।
চামড়ায় লবণ না দিতে পারলে কী করবেন?
যাঁরা লবণ দিতে পারবেন না, তাঁদের উচিত দ্রুত নিকটবর্তী আড়তে বিক্রি করে দেওয়া। পোস্তা ছাড়াও রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, গুলশান, বনানী, মিরপুর, টঙ্গী, কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, আমিনবাজার, সাভার, হেমায়েতপুরসহ বহু স্থানে চামড়া কেনেন আড়তদাররা।
তবে স্মরণে রাখতে হবে, পশু জবাইয়ের সময় চামড়া সতর্কভাবে ছাড়ানো হলে তবেই ভালো দর মেলে।
ঢাকায় চামড়া আনা যাবে ঈদের ১০ দিন পর
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোরবানির ১০ দিন পর পর্যন্ত ঢাকার বাইরে থেকে কাঁচা চামড়া ঢাকায় আনা যাবে না। এতদিন তা শুধু স্থানীয় আড়তেই বিক্রি করতে হবে।
চামড়া বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি খাত। এটি কেবল বাজারে বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রক্রিয়াজাত করার পরই তৈরি হয় মূল্যবান পণ্য। তাই সচেতনতা আর সঠিক পদ্ধতিতেই সম্ভব ঈদের চামড়া থেকে প্রাপ্য আয় নিশ্চিত করা। চামড়া নষ্ট না করে বরং লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করুন, বিক্রি করুন ঠিক দামেই—এটাই হোক এবারের ঈদের অঙ্গীকার।