গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল থেকে ৭ মাস ১৩ দিন পালিয়ে থাকার পর আবার কর্মস্থলে ফিরেছেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফায়ার অপারেটর দীপংকর চৌধুরী। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়–য়াসহ আওয়ামী লীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে দেশ থেকে পালাতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন দীপংকর। গত ১৩ এপ্রিল কর্মস্থলে যোগদান করেন। বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার পুনরায় কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ‘অস্বস্তিতে’ পড়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
দীপংকরের দাবি, ৭ মাস ১৩ দিন জনৈক ডা. মো. হানিফ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ব্রঙ্কাইটিস ও ওটিটিএস মিডিয়া রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সুস্থতাবোধ করায় গত ১৩ এপ্রিল নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ৭ মাস ১৩ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় মামলা দায়ের করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ২২৫ দিন পলাতক থেকে দীপংকরের কর্মস্থলে ফিরে আসা এবং তার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা তদন্তাধীন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর।
পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে বিপ্লব বড়–য়াকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে পালাতে সহযোগিতা করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে দীপংকরের বিরুদ্ধে। এছাড়া এয়ারপোর্টের টার্মিনালের অ্যারাইভাল এরিয়ায় নামাজের স্থান বাতিল, বিএনপিপন্থি বিভিন্ন মানুষকে রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে সখ্য এবং একটি শিল্প গ্রুপের এজেন্ট হয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দরে নানা বিতর্কিত কর্মকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে দীপংকরের বিরুদ্ধে। উক্ত দুই নেতার সঙ্গে দীপংকরের ছবি ফেসবুকেও ভাইরাল হয়েছে। দীপংকরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে বলে বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেবিচক কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০২১ এর বিধি ৪৯(খ) ও (গ) অনুযায়ী যথাক্রমে ‘অসদাচরণ’ ও পলায়নের পর্যায়ভুক্ত অপরাধ হওয়ায় তার (দীপংকর চৌধুরী) বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় মামলা করে বেবিচক। গত বছরের ৩০ অক্টোবর তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানের এক সপ্তাহ পরে গত ২১ এপ্রিল তার বেতন-ভাতা পুনরায় চালু করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের ফায়ার শাখায় কর্মরত আছেন দীপংকর। তার আগের কর্মস্থল ছিল ভিআইপি লাউঞ্জে।
বিভাগীয় মামলা রুজুর পর অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব দাখিলের নির্দেশনা দিয়ে গত ২৩ মার্চ দীপংকরের স্থায়ী ঠিকানায় চিঠি দিলেও সেটিও বেবিচকের কাছে ফেরত আসে। এরপর বেবিচকের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন মিয়াকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় বেবিচকের শৃঙ্খলা ও তদন্ত শাখা। এর আগে গত বছরের ১২ নভেম্বর তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করে চিঠি দেন বেবিচকের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) রমা বিশ^াস। অভিযোগের বক্তব্য জানতে চাইলে মাইল্ড স্ট্রোক করেছেন বলে দাবি করে ফায়ার অপারেটর দীপংকর চৌধুরী বুধবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মরে গেলে ভালো হয়। মরে গেলে সংবাদে লিখতে পারবেন মরে গেছি।’
জানা গেছে, দীপংকর চৌধুরীর বাবার নাম মৃত বাবুল কুমার চৌধুরী। তার স্থায়ী ঠিকানা ৫৮ ঘাটফরহাদবেগ সৎসঙ্গ তবাশ্রম, মোমবাতি গলি, দেওয়ানবাজার ওয়ার্ড, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম। অভিযোগ, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরদিন (৬ আগস্ট) সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় সাবেক এক কর্মকর্তার সরকারি বাসায় রাতে অবস্থান করেন। ৭ আগস্ট সকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বিপ্লবকে তুলে দেন ওই কর্মকর্তা। শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আরেকটি উড়োজাহাজে করে বিপ্লব বড়–য়া যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ওই কর্মকর্তার হয়ে মাঠ পর্যায়ে সবকিছু তদারকি করেন দীপংকর চৌধুরী।