চামড়া নিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টার যত কথা

১০ বছরে চামড়ার দাম সর্বোচ্চ

গত ১০ বছরে এবার সর্বোচ্চ দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। যা বিগত দিনে ছিল না। আগামী বছর চামড়ার মূল্য আরও বৃদ্ধির পাবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, চামড়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চলছে, চামড়া নিয়ে কেউ যেন অপপ্রচার করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার করতে দেখা গেছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নাটোরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

বগুড়ায় অপর এক অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় দেশে প্রথমবার সাড়ে সাত লাখ টন লবণ বিনামূল্যে মসজিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক সরকার এ ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তি দান করতে পারবে।

তিনি বলেন, চামড়ার দাম কম পাচ্ছে বিষয়টি সঠিক নয়, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছেন। সেক্ষেত্রে লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

এর আগে গত সোমবার ঢাকার লালবাগের পোস্তায় পশুর চামড়া ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় বাণিজ্য উপদেষ্টা দাবি করেন সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত দাম কার্যকরে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ দল।

চামড়ার দাম নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমরা  যে চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিলাম সেটি ছিল লবণসহ দাম। ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা  যেটা বিক্রি হচ্ছে সেটি লবণ ছাড়া। বিগত বহু বছর ধরে যে দামে বিক্রি হতো এই দাম তার থেকে বেশি।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম পাচ্ছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা অসত্য। অসত্য এজন্য যে কিছু মৌসুমী ব্যবসায়ী যাদের চামড়া সংরক্ষণের ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তারা চামড়া নিয়ে আধা পচা করে ফেলছে। আধা পচা চামড়া ৭শ-৮শ টাকায় বিক্রি হলে  তো এটা অনেক বেশি। আর যেটা ভালো চামড়া সেটি ১২ থেকে ১৩শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে আমরা যে কাজটা শুরু করি তাহলো স্থানীয়ভাবে মজুদ এবং লবণ দেওয়াকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণ উপযোগী ও মজুদ উপযোগী করা। যার ফলে বাজার ব্যবস্থাপনায় একটা স্থিতি এবং বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি চামড়ার উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে যেটা লবণ দেওয়া চামড়া। সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সেটা বিক্রি হচ্ছে। কিছু কিছু  ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া ও মেইনস্ট্রিমের কিছু মিডিয়াও ভুল তথ্য প্রচার করছে। চামড়া পচে গিয়েছে এমন একটি তথ্য দেখলাম চিটাগাং-এর রাঙ্গুনিয়ার। একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী ৬২০টির মতো চামড়া নিয়ে এসেছেন, তিনি চামড়াটি সংরক্ষণ উপযোগী করেননি। চামড়াটি আধা পচে গেছে। এটা নিয়ে একটি অপপ্রচার চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা একত্র হয়ে চামড়ার বাজারে আবারও একটা ধস নামানোর পরিকল্পনা করছে।

সরকার চাহিদা তৈরির জন্য কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। সারা দেশের প্রত্যেক জেলায়, উপজেলায়, গ্রামে মসজিদে মসজিদে লবণ  পৌঁছে দিয়েছে। এককভাবে সরকারকে দায়ী করে কিছু ভুল তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে চামড়ার বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা ন্যক্কারজনক কাজ হবে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, চামড়ার দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। আশা করছি লবণযুক্ত চামড়ার দাম আরও বাড়বে। আমরা চামড়া সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে দুই থেকে তিন মাস চামড়া ধরে রাখতে (সংরক্ষণ) পারবেন। ধরে রেখে উপযুক্ত দাম না পাওয়া পর্যন্ত বিক্রি না করার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে গত সোমবার যশোরের রাজারহাটে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাটে কোরবানির চামড়ার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, দেশের চামড়া শিল্পে বিগত ১৫ বছরে ব্যাপক নৈরাজ্য হয়েছে এবং এর ফলে শিল্পটির চরম অধঃপতন হয়েছে। এ খাতে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা নির্মূলে সরকার কাজ করছে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আমরা চামড়া শিল্পে সবার আগে এতিমখানা ও মাদ্রাসার স্বার্থরক্ষায় কাজ করছি। পাশাপাশি দেশের চামড়া শিল্পের সার্বিক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে চামড়া শিল্পের যে অধঃপতন ঘটেছে, তা পুনরুদ্ধার এবং অবৈধ সিন্ডিকেট ভাঙতে আমরা সারা দেশে কাজ করছি।

চামড়ার সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা ও মূল্য বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার সারা দেশে লবণ বিতরণ করেছে উল্লেখ করে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, চামড়ার দাম বাড়াতে সংরক্ষণের জন্য ৭ লাখ ৫০ হাজার মণ লবণ বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ চামড়ার মূল্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। অনেক মাদ্রাসা লবণ ছাড়াই চামড়া সংগ্রহ করেছে। অথচ সরকার লবণ ছাড়া চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে না। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তা নষ্ট করেছেন। ফলে কাক্সিক্ষত মূল্য পাননি।

তিনি আরও বলেন, চামড়া শিল্পের নৈরাজ্য নিয়ে এখনো সরকারের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। অথচ সরকার চামড়া রক্ষায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সবার সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারব।