নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না চামড়া

নানা উদ্যোগের পরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে সারা দেশে কোরবানির গরু-মহিষের চামড়া বিক্রি হচ্ছে, চাহিদা নেই ছাগল-ভেড়ার চামড়ার। দাম না পেয়ে কোথাও কোথাও এই চামড়া মৌসুমি বিক্রেতারা রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন, আবার সংরক্ষণ করা হয়েছে কোনো কোনো স্থানে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, লবণ দেওয়া ছাড়া গরু-মহিষের চামড়া ৭০০-৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। সরকার ঢাকায় সর্বনিম্ন গরুর চামড়া ১৩৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ১১৫০ টাকায় যেটা নির্ধারণ করেছে তা মূলত লবণযুক্ত চামড়ার দাম।  

কোরবানির ঈদে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মৌসুমি বিক্রেতা নুরুল আবসার ৫২০টি চামড়া গড়ে ২০০ টাকা দামে কেনেন। কিন্তু তিনি একটি চামড়াও বিক্রি করতে পারেননি। ঈদের পরদিন নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় সড়কে চামড়া ফেলে বাড়ি চলে যান। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ঈদের দিন রাত থেকেই তিনি চামড়া বিক্রির চেষ্টা করলেও আড়তদাররা চামড়া কেনেননি। তার মতো একই অবস্থা মৌসুমি বিক্রেতা দিদারুল আলমের। তিনিও হাটহাজারী থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার চামড়া কিনেছিলেন, কিন্তু বিক্রি করতে পারেননি।

 ফেনীর মৌসুমি বিক্রেতাদেরও একই অবস্থা। তাদের অনেকে রাস্তায় এবং নদীতে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বিক্রি করতে না পেরে। ফেনীর পরশুরামের চিথলিয়া ইউনিয়নের সিলোনিয়া নদীতে চামড়া ফেলার অপরাধে শুক্কুর আলী নামের মৌসুমি ব্যবসায়ীকে আটকও করা হয়েছে। তিনি ইদের দিন ৫০০-৬০০ টাকা করে চামড়া কিনলেও বিক্রি করতে পারেননি। যে কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে নদীতে ফেলে দেন চামড়াগুলো।

 ফেনী সদরসহ ৫টি উপজেলায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন বাজারের রাস্তায় পচা চামড়া পড়ে রয়েছে। যেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে যা সাধারণ মানুষের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে ঢাকা ও আশপাশের বড় আড়তগুলোতে চমড়ার সরবরাহও খুব বেশি নেই।

এদিকে ঈদের দিন (শনিবার) থেকে শুরু করে মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকার পোস্তার আড়তদাররা মাত্র ৮০ হাজার পিস চামড়া কিনেছে। এসব চামড়া ৬০০-৮০০ টাকার মধ্যে কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া সাভার শিল্পনগরীতে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৮টি গরু-মহিষের চামড়া ও প্রায় ২১ হাজার ছাগল-ভেড়ার চামড়া কেনা হয়েছে।

জানা যায়, শনি ও রবিবার আড়তদাররা গরুর চামড়া কেনেন ২০০ থেকে শুরু করে ৯০০ টাকার মধ্যে। ছোট গরুর চামড়া বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি ও বড় আকারের গরুর চামড়া বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়। তবে আড়তদাররা দাবি করেন, শ্রমিক, লবণ ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতিটি চামড়ায় সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০০ টাকার মতো খরচ হয়।

তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাবি করেন, এবারে চামড়ার দাম গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে আরাফাত লেদারের কর্ণধার মো. জিবলু জানান, প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছে। চামড়া গোডাউনে ঢোকানো, লবণ লাগানো থেকে সব কাজে খরচ পড়ে আরও ৪০০ টাকা। শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাঁচা চামড়ার দাম কিছুটা কম ধরা হচ্ছে। এরপরও সব মিলিয়ে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মতোই খরচ হয়।

এদিকে ঈদের দিন বিকেল থেকে সোমবার পর্যন্ত সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে সংগৃহীত  কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার পরিমাণ গতবারের চেয়ে কম বলে জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। তাদের দাবি সরকার মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে লবণ দেওয়ায় অনেক মাদ্রাসা এবং এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সংগ্রহ করা কোরবানির পশুর চামড়া নিজেরাই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছেন। যার ফলে এবার ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়া সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলা থেকে কোরবানির পশুর চামড়া ঢাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কর্মব্যস্ততা নেই সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে।

গত রবিবার ও সোমবার চামড়া শিল্পনগরীর বিভিন্ন ট্যানারি ঘুরে দেখা গেছে, ট্যানারিগুলোতে চামড়ার স্তূপ আগের চেয়ে কম। কাক্সিক্ষত চামড়া না থাকায় শ্রমিকদের লবণ লাগানোর কর্মব্যস্ততা নেই। বেশিরভাগ কারখানা ঘুরে মালিক এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। কিছু কিছু ট্যানারিতে অল্প পরিমাণে চামড়ায় লবণ মাখিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কিছু ট্যানারিতে চামড়ার সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত অংশ  কেটে লবণ লাগাতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান বলেন,  কোরবানির ঈদের দিন শনিবার দুপুর থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার পিস। তবে এ সময়ের মধ্যে ট্যানারিতে ৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।  

তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে ঈদ পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে ঢাকায় বাইরের চামড়া প্রবেশ করতে পারবে না। এর মধ্যেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সিলেট থেকে দুই হাজার চামড়া নিয়ে সাভারে এসেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

 সোনারবাংলা ট্যানারির মালিক আব্দুর শহিদ দুলাল জানান, সারা বিশ্বেই চামড়ার মূল্য কমে যাওয়ায় বাংলাদেশেও চামড়া শিল্পে এখন মন্দা অবস্থা। আমরা বেশি দামে কিনলে সেই চামড়া থেকে লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে আমরা সরকারের নির্ধারিত মূল্যেই চামড়া ক্রয় করছি। তবে কিছু মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী বিভিন্ন এলাকা  থেকে চামড়া সংগ্রহ করে ট্যানারিতে বিক্রি করতে এলেও কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে আসেননি।

সাভারের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রতিটি চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় কিনে ট্যানারিতে বিক্রি করতে আসছিলাম। কিন্তু আড়তদার বা ট্যানারি প্রতিষ্ঠান ৭৫০ টাকার ওপরে চামড়ার দাম বলে না। বাধ্য হয়ে ৭৫০ টাকা দরেই চামড়া বিক্রি করেছি কিন্তু ভ্যান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।

সাভার কাঁচা চামড়া আড়ত মালিক সমিতির সহ-সভাপতি ও মা সুফিয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহন বাদশা বলেন, গতবারের চেয়ে এবার কাঁচা চামড়ার সরবরাহ কম। সরকার নির্ধারিত মূল্যেই আমরা চামড়া আকার ভেদে ৮০০-৯০০ টাকায় ক্রয় করছি। যারা ভালো চামড়া আনতে পারে তারা চামড়ার মূল্য ভালো পায় অন্যদিকে যারা নষ্ট চামড়া নিয়ে আসে তারা তুলনামূলক দাম কম পায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, এবারের ঈদে কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু। যার মধ্যে ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি গরু ও মহিষ, ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি ছাগল-ভেড়া এবং ৯৬০টি অন্যান্য পশু। কোরবানিযোগ্য ১ কোটি ২৪ লাখ পশুর মধ্যে এবারে অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি পশু।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এবারে চামড়ার বাড়তি দামের জন্য সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর একটি হচ্ছে চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে সাড়ে ৭ লাখ মণ লবণ বিতরণ। যা দিয়ে সারা দেশের মাদ্রাসা, মসজিদগুলোর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগে মোট ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩৭টি গরু, মহিষ ও ছাগলের চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু-মহিষের চামড়ার সংখ্যা ১৫ লাখ ৮ হাজার ৫০৯টি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, মাদ্রাাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোতে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করায় এই চামড়াগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা তিন মাস পর্যন্ত রাখা যাবে।

কম দামে চামড়া বিক্রি হওয়া নিয়ে অবশ্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের জানান, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু লবণবিহীন চামড়ার দাম নির্ধারণ করেনি। তিনি বলেন, গত ১০ বছরের মধ্যে এবারের চামড়ার দাম ছিল সর্বোচ্চ।

গত ২৬ মে কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০-৬৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা। ঢাকার বাইরের গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০-৫৫ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে প্রতি বর্গফুট কোরবানি (গরুর) পশুর চামড়ার মূল্য ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ২০১৫ সালে ৫০-কে ৫৫ টাকা, ২০১৬ সালে ৪৫-কে ৫০ টাকা, ২০১৭ সালে ৪০-কে ৫০ টাকা, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৪৫-কে ৫০ টাকা, ২০২০ সালে ৩৫-কে ৪০ টাকা, ২০২১ সালে ৪০-কে ৪৫ টাকা, ২০২২ সালে ৪৭-কে ৫২ টাকা, ২০২৩ সালে ৫০-কে ৫৫ টাকা, ২০২৪ সালে ৫৫-কে ৬০ টাকা এবং সবশেষ ২০২৫ সালে নির্ধারণ করা হয় ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। উল্লিখিত মূল্য ঢাকা ও পাশর্^বর্তী এলাকার জন্য নির্ধারিত। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা কম নির্ধারণ হয়ে থাকে। পাশাপাশি প্রতি বছরই ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলেও সেটা কার্যকর হয় না এবং ছাগলের চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।