১৯৭৫ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াল দিন। এ দিন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী একদলীয় বাকশাল কায়েম করে দেশের সব রাজনৈতিক দল এবং স্বাধীন সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে দেয়। কেবল চারটি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন পত্রিকা ছাড়া বাকস্বাধীনতার সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে শত শত সাংবাদিক জীবিকা হারান, পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। স্বাধীনতার যে মহান লক্ষ্য ছিল সেটি শুধু ভৌগোলিক মুক্তি নয়, ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়; যার কেন্দ্রে ছিল মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই সেই চেতনার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতার ছাপ স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রকে আবদ্ধ করা হলো একদলীয় শৃঙ্খলে, নির্মমভাবে হরণ করা হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। এমন সংকটময় মুহূর্তে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা শুরু হয়। বাকশালের অগণতান্ত্রিক আইনগুলো বাতিল করে তিনি চিন্তা, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকতে পারে না। একে হরণ করা মানে, গণতন্ত্রের শিকড় কেটে ফেলা। গণমাধ্যম যখন নীরব, তখন রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা বিলীন হয় জবাবদিহিতার জায়গায় তৈরি হয় ভয়। পরবর্তী সময়ে সেই ভয়ই জন্ম দেয় স্বৈরতন্ত্রের। এর ফলে জগদ্দলের মতো চেপে বসে স্বৈরশাসক। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি কেবল একটি দলের রাজনৈতিক রূপরেখা নয়, এটি জাতীয় পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই কর্মসূচির ১১ নম্বর দফায় প্রস্তাব করা হয়েছে, একটি স্বাধীন ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠনের, যেখানে সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, পেশাদার সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্ত থাকবেন। এই কমিশন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব প্রদান করবে। তাছাড়াও সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ সব ধরনের কালাকানুন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কেবল পেশাগত নিরাপত্তা নয়, বরং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্তর্গত শর্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি। এটি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার, যা নাগরিকদের নিজস্ব চিন্তা, মতামত ও বিশ্বাস প্রকাশের অবাধ সুযোগ দেয়। এই অধিকার ছাড়া গণতন্ত্র কেবল নামমাত্র এক কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়, যার আবরণ থাকলেও অন্তঃসার থাকে শূন্য।
গণতন্ত্র কেবল শাসনব্যবস্থা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক। এটি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মুক্ত মতপ্রকাশের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণের মতামত গ্রহণ ও সম্মান করাই গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারংবার নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। এখন সময় এসেছে গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে গড়ে তোলার। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে সর্বোচ্চ মাত্রায় জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক হতে হবে। আইন, আদালত ও প্রশাসনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সবাই সমান অধিকার ও সুযোগ পায়। আইনের শাসনই গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি, যা ক্ষমতার প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করে। গণতন্ত্র মানে শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীকও বটে। মৌলিক চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যতীত গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য অর্জিত হয় না। দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র গড়ে ওঠে তখনই, যখন সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মতামত সম্মিলিত হয়ে নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে সুস্থ আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন সহিষ্ণু ও গঠনমূলক হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়, যা সমাজকে অস্থিতিশীল ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। তাই স্বাধীন গণমাধ্যম ও মুক্ত মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করাই নিশ্চিত করে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পৌঁছানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অর্থ কখনো ‘যা ইচ্ছা তাই করা’ নয়, বরং এমন একটি স্বাধীনতা যার মধ্যে অন্যের অধিকার ও কল্যাণকে সম্মান করা হয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বেরও এক অঙ্গ। প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন ব্যক্তি নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে, কিন্তু তা অন্যের অধিকার রক্ষায় কোনো ধরনের ক্ষতির কারণ হয় না। এমন সত্যিকারের স্বাধীনতার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, সহনশীল ও ন্যায়সংগত সমাজ গড়ে ওঠে, যেখানে সবার অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয়। মতপ্রকাশের অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। যখন গণমাধ্যম অবাধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তখন তা সমাজের লুকানো সত্য, অবিচার ও অপশাসনের চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরে এবং সচেতন ও সক্রিয় জনমত গড়ে তোলে। একসময় এই জনমতই দুর্নীতি, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সমাজবিরোধী শক্তিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে দায়িত্ববোধের যে ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক তা দৃঢ় হয় স্বাধীন সাংবাদিকতার মাধ্যমেই। এই প্রস্তাবনা একটি মুক্ত গণমাধ্যমের সম্ভাবনা উন্মোচন করে, যেখানে ‘সত্য’ কোনো দলীয় প্রচারণা নয়, বরং জনগণের অধিকার। ‘সত্য বলো, সত্য বলো’ এ কেবল একটি নীতিকথা নয়, এটি ইতিহাসের ডাক। কিন্তু যখন রাষ্ট্র আয়নায় মুখ দেখার সাহস হারায়, তখন সেই আয়নাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শত্রু। সংবাদপত্র সেই আয়না, যেখানে শাসক দেখে নিজের চেহারা, আর জনগণ দেখতে পায় রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বহু বছর ধরেই সেই আয়নার মতো ধুলো জমেছে, ফাটল ধরেছে, কখনো ভেঙেও ফেলা হয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’ নামের এক অদৃশ্য হাতুড়ির আঘাতে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয় এটি গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার শ্বাস-প্রশ্বাস। ২০১৪ থেকে ২০২৪ এই এক দশক ধরে সংবাদমাধ্যমকে পরিণত করা হয়েছে এক নিয়ন্ত্রিত তথ্য-ব্যবস্থায়। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ, কর জটিলতা, নিরাপত্তা আইনের ভয় এসব দিয়ে সাংবাদিকতা পরিণত হয়েছে এক নীরব সেলফ-সেন্সরড যন্ত্রে।
যখন সত্য চাপা পড়ে, তখন প্রশ্ন মুছে যায়। আর সেই অনুচ্চারিত নীরবতা থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরতন্ত্র। এই প্রবণতা নতুন নয়, ’৭৫-এ রাষ্ট্রায়ত্ত করা সংবাদপত্র, সামরিক শাসকদের কৌশলী নিয়ন্ত্রণ ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমল সব যেন অতীতেরই প্রতিচ্ছবি। সরকারি বিজ্ঞাপননির্ভর বাজেট, অনুগত বিশ্লেষকদের দখলে থাকা পর্দা সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য ‘ডিপ-স্টেট মিডিয়া মডেল’। যেখানে সংবাদ নয়, চলে নির্দেশিত বার্তা। প্রশ্ন নয়, থাকত অনুমোদিত প্রচারণা। রাষ্ট্র যদি হয় জীবন্ত দেহ, তাহলে সংবাদপত্র তার অনুভূতি। সেই অনুভূতি নিঃশেষ হলে গণতন্ত্র কেবল ফাঁকা খোলসে পরিণত হয়। আজ সাংবাদিকতা মানেই যেন দুঃসাহসিকতা। সম্পাদকীয়তে সমালোচনার জায়গা নেই, বিরোধী নেতারা টিভি পর্দা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। রাষ্ট্র যখন সত্যকে ভয় পায়, তখন সংবাদপত্র হয়ে ওঠে ‘অপরাধী’। ২০১২ সালের সাগর-রুনির নির্মম হত্যা এই আতঙ্কের চূড়ান্ত প্রতীক। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধী গ্রেপ্তারের ঘোষণা আজ ১৩ বছর পরও প্রতীক্ষায়। সাংবাদিকতা যেন সেই দিন থেকেই মৃত্যুপথযাত্রী। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। আগের বছর ছিল ১৬৫। এই উন্নতির পেছনে একটিই কারণ শেখ হাসিনার অবর্তমানে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ মিলেছে। ভিন্নমত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ, তবে তার কণ্ঠ কিছুটা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন রয়ে যায় এই শ্বাস কি টিকে থাকবে? নাকি এই সাময়িক অবকাশও আবার নিয়ন্ত্রণের শেকলে বাঁধা পড়বে? একটি বড় সংকট হলো, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। কিছু ক্ষেত্রে করপোরেট মিডিয়া যখন সংবাদ পরিবেশন করে তাদের স্বার্থরক্ষার যুক্তিতে, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় প্রপাগান্ডা। যেকোনো ভিন্নমত দ্রুত ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, টকশো বিশ্লেষক কিংবা সাংবাদিক হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরদারির শিকার।
এই অনুপস্থিত গণমাধ্যমই দুর্নীতির আড়াল তৈরি করে। তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য চাপা পড়ে যায়, রাষ্ট্রের ভুল নীতিমালা চলতে থাকে প্রশ্নহীনভাবে। অথচ সংবাদপত্রের ভূমিকা কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তি বিকাশ নয়, সত্য অনুসন্ধানের পূর্বশর্ত। সংবাদপত্র সেই সত্যের বাহক। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে চাই শক্তিশালী, দায়িত্ববান, নির্ভীক গণমাধ্যম, যা সরকারের মুখপাত্র নয়, বরং জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তুলে ধরে। শেষ কথা কোনো শাসক সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে চিরস্থায়ী হয়নি। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সত্যকে দমন করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। যে রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা লিখতে ভয় পায়, সেখানে গণতন্ত্র, বিচার, উন্নয়ন সবকিছুই রয়ে যায় সন্দেহের ছায়ায়। বাংলাদেশ আজ এক নতুন অভিযাত্রার সূচনা পথে দাঁড়িয়ে। এই অভিযাত্রার প্রথম ধাপ হোক বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবেই গড়ে উঠবে এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে সংবাদপত্র হবে আয়না, আর রাষ্ট্র সেই আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিকে সম্মানের চোখে দেখবে, ভয় নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
sayed.reporter@gmail.com