৫ জুন বাংলাদেশসহ পৃথিবীতে পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল- Beat plastic polution বা নির্মূল করো প্লাস্টিক দূষণ। এটি হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস। যার সঙ্গে মানবজাতির অস্তিত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শুধু মানবজাতি কেন? পৃথিবীর আলো, বাতাস, মাটি, আবহাওয়া, প্রাণিকুল ও তাদের বাস্তুসংস্থান, উদ্ভিদ, লতাপাতা, অণুজীবের জীবন জড়িত। বিষয়টি আমাদের প্রাণ-পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য একটি মহাচ্যালেঞ্জ। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা পৃথিবীর সব সচেতন মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়। এই সমস্যা সমাধানের পথ, প্লাস্টিক বর্জ্য ধ্বংস এবং থ্রি-আর অর্থাৎ reduce, Reuse and recyle বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহারের গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ আজ সারা বিশ্বের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালে বৈশি^ক প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৬০ সালে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে তিনগুণে।
সারা বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ নির্মূলে দক্ষিণ কোরিয়াতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্লাস্টিক দূষণের অভিশাপ থেকে সারা বিশ্বকে মুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এবার জলবায়ু পরিবর্তন, কাক্সিক্ষত উন্নয়ন, সমুদ্র সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে প্লাস্টিক দূষণের অবসান এই প্রতিপাদ্যটি বিশ্বপরিবেশ দিবসের একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এটি সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের সবাইকে প্লাস্টিক বর্জ্য নির্মূল, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং একটি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানায়। আমাদের চারপাশের ইট-পাথর, পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, খালবিল, বন্যপ্রাণী, গাছপালা, লতাগুল্ম এমনকি মাটি, পানি ও বাতাসে বসবাসকারী অণুজীব এসব কিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। কিন্তু দিনের পর দিন আমরা যেভাবে অনৈতিক কার্যক্রম দ্বারা পৃথিবী ধ্বংস করছি, তার পরিভোগ আমাদেরই পোহাতে হবে।
প্লাস্টিক দূষণ আজ বিশ্বে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এই দূষণ এমনভাবে বাড়ছে যে, তা রীতিমতো মানব অস্তিত্বের জন্য গুমকি হয়ে পড়েছে। নদী, খাল-বিল, জলাশয় প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যা পরিশেষে গিয়ে জমা হচ্ছে সাগরগর্ভে। নদী-জলাশয়ে জমে থাকা প্লাস্টিকের আস্তরণের কারণে ভূগর্ভে পানি প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে। নানা মাধ্যমে প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রো-প্লাস্টিক মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। রক্ত পরীক্ষায়ও মিলছে মাইক্রো-প্লাস্টিকের উপস্থিতি। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি টন প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোয় যেখানে ৮০ শতাংশের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল বা পুনঃপ্রক্রিয়া করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ৩৭ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়া করা সম্ভব হয়। এসব কারণে ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)’-এর সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম।
প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা এখন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর প্রধান ভোগান্তি। এর মূল কারণ পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জমে ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির পানি নামতে না পারা। তখন সাধারণ মানুষ সরকারকে দোষ দেয় আর সরকার যত্রতত্র প্লাস্টিক/পলিথিন ফেলার জন্য মানুষকে দোষ দেয়। চলতে থাকে দোষারোপের খেলা। অন্তর্বর্তী সরকার প্লাস্টিক দূষণরোধে কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে তার খুব একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। এর একটি বড় কারণ প্লাস্টিক ব্যাগের সুবিধাজনক বিকল্প সহজলভ্য না হওয়া। সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিক বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এখনো প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের মধ্যেও প্লাস্টিকের ক্ষতিকারকতা নিয়ে সচেতনতার অভাব। মানুষকে সচেতন করা গেলে এবং গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে আলাদাভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করার পর পুনঃপ্রক্রিয়া করা গেলে, প্লাস্টিক দূষণ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ-উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের মোট পরিমাণ ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৯০ লাখ কোটি টাকা। গত বাজেটে যার পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৯৭ লাখ কোটি টাকা। সে হিসেবে এবারের বাজেটে মোট বরাদ্দ কমেছে ৭ লাখ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরেরর মোট বাজেট বরাদ্দ কমানো হলেও জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। নতুন বাজেটে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্যনিরাপত্তা খাতে ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। এ জন্য এ বাজেট গতানুগতিক হলেও প্রশংসার দাবিদার। অন্যদিকে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণরোধে সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করার একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই এবং এর সফল বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি। ফলে চা-কফির কাপ, প্লাস্টিক প্লেট ও বাটির মতো পণ্যের ওপর ভ্যাট বেড়ে ১৫ শতাংশ হবে। এর ফলে এসব প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়বে এবং ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে ব্যবহারকারীরা। তবে এসব পণ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্যের ওপর কোনো ভ্যাট আরোপ করা হয়নি। এর ফলে দেশে প্লাস্টিক বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বাড়বে। বাঁশ, বেত, পাট, কাঠ, হোগলা, তালপাতা থেকে তৈরি পণ্যের কারিগরদের কর্মসংস্থানের নতুন করে সুযোগ সৃষ্টি হবে। মাটি, পানি ও বাতাস ভয়াবহ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে। উন্নত হবে বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@Gmail.com