‘শর্ট সিলেবাস’ ও ‘বিলম্বিত পরীক্ষা’র দাবি কতটুকু যৌক্তিক?

প্রতিটি সভ্য সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে। অথচ বাংলাদেশে করোনা-পরবর্তী সময় থেকে বছরের পর বছর ধরে আমরা একটি বিপরীত বাস্তবতার সাক্ষী হচ্ছি, যেখানে ছাত্রসমাজ নিজেই, কখনো সজ্ঞানে কখনো অনিচ্ছায়, সেই ভবিষ্যতের ভিত্তিমূলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ‘শর্ট সিলেবাস’ ও ‘বিলম্বিত পরীক্ষার’ দাবিকে কেন্দ্র করে যে ধারাবাহিক আন্দোলন প্রতিবছরই গর্জে ওঠে, সেটি মূলত শিক্ষার্থীদের সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও নীতিগত পতনের লক্ষণ। এই দাবিগুলোর পেছনে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক সুবিধার প্রলোভন থাকলেও, এর গভীর প্রভাব শিক্ষার মানকে ধ্বংস করছে, জ্ঞানের গভীরতাকে সংকুচিত করছে এবং একটি প্রজন্মকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

শিক্ষা শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি জাতির চেতনা, নৈতিকতার ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের কারখানা। কিন্তু এই বাৎসরিক আন্দোলনগুলো শিক্ষার সেই পবিত্র উদ্দেশ্যকে কলুষিত করছে। ক্রমান্বয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্বহীনতা, শৃঙ্খলার অভাব এবং জ্ঞানের প্রতি অশ্রদ্ধার মানসিকতা জন্ম দিচ্ছে। শর্ট সিলেবাসের দাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের গভীরতার অপ্রয়োজনীয়তা, পরীক্ষায় পাস করার জন্য ন্যূনতম প্রস্তুতিই যথেষ্টর মতো ভয়ানক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করছে। কিন্তু বাস্তবিক জীবনে একটি পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শিক্ষার্থীদের বিষয়ের বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, তাদের যুক্তিবাদী চিন্তাধারা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু শর্ট সিলেবাস এই সুযোগ কেড়ে নেয়, কেবল সহজ অংশগুলো রেখে শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণাগুলোর গভীর বোঝাপড়া থেকে বঞ্চিত করে। ২০২৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষার সময় শর্ট সিলেবাসের দাবিতে আন্দোলনের ফলে সিলেবাসের প্রায় ৩০ শতাংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এবং মানবিক বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। এই ঘাটতি তাদের উচ্চশিক্ষায় প্রভাব ফেলছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, তাদের মৌলিক ধারণাগুলো দুর্বল যা শর্ট সিলেবাসের কারণে সৃষ্ট। এই পরিসংখ্যান একটি নিছক সংখ্যা নয়; এটি একটি প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ, যা জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছে। এই দাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের প্রতি অশ্রদ্ধা সৃষ্টি করছে, শর্টকাট ধারণার প্রসার ঘটিয়েছে, কঠোর পরিশ্রম এবং গভীর জ্ঞানের মূল্যকে অগ্রাহ্য করেছে। এই বিপদ আরও তীব্র হয় তখনই, যখন শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বিলম্বের দাবি তুলে ধরে, যা তাদের মধ্যে দায়িত্বহীনতা এবং সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব জন্ম দেয়। পরীক্ষার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া কেবল তাদের অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় দেয় না; বরং এটি তাদের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে যে, তারা যে কোনো সময় দাবি জানিয়ে নিজেদের অপ্রস্তুতির দায় এড়াতে পারে। বাস্তব জীবনে এই মানসিকতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

২০২১ সালে মহামারীর সময় এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা বিলম্বের ফলে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে লম্বা সময়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছিল এবং অনেক শিক্ষার্থী একটি বছরের শিক্ষাগত জীবন হারিয়েছে। মূলত এই আন্দোলনগুলোর পেছনে প্রায়শই ন্যায়সংগত দাবির আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টা লুকিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে রাজপথে নামানো হয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, আন্দোলনই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু বাস্তবে, এই আন্দোলনগুলো শিক্ষার মানকে নিচে নামিয়ে আনে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ চক্রে বন্দি করতে বাধ্য করে। প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে প্রশাসনকে চাপের মুখে ফেলে। এরপর প্রশাসন দাবি মেনে নেয়, যা শিক্ষার মানকে হ্রাস করে। ফলে শিক্ষার্থীরা আরও দাবি উত্থাপনের জন্য উৎসাহিত হয় এবং এই চক্র বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং শিক্ষকরা হতাশায় পড়েন, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন এবং সমাজে শিক্ষিত, দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে, কারণ তাদের জ্ঞানের ভিত্তি দুর্বল এবং তারা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। তার জন্য শিক্ষা প্রশাসনকে শর্ট সিলেবাস এবং পরীক্ষা বিলম্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং পঠন-পাঠনের মান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। বলতে হবে, তারা যেন শর্টকাটের পথে না হেঁটে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করে। কারণ সফলতার কোনো শর্টকাট পথ হয় না। শিক্ষার গুরুত্ব এবং জ্ঞানের মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা শর্টকাটের জন্য নয়। এটি ধৈর্য, পরিশ্রম ও দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে গঠিত একটি কাঠামো। ‘শর্ট সিলেবাস’ ও ‘বিলম্বিত পরীক্ষা’র মতো দাবিগুলো সেই কাঠামোকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করছে। এ অবস্থা শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না বরং একটি জাতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে দশকের পর দশক। শক্তিশালী শিক্ষা কাঠামো নির্মাণের জন্য দরকার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান, সুশৃঙ্খল পাঠ্যপাঠ এবং নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা সম্পন্ন করার সংস্কৃতি যা আমাদের একটি আত্মনির্ভর, দক্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাতিতে পরিণত করবে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনেও বাংলাদেশিরা একটি মেধাবী জাতি হিসেবে পরিচিত হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ

proggadas2005@gmail.com