ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ফায়দা হবে কার?

শাসকগোষ্ঠীর জন্য যুদ্ধ বরাবরই লাভজনক। রাজনৈতিক লাভ তো বটেই, অর্থনৈতিক লাভও যুদ্ধের বড় কারণ। সম্ভবত, আসল কারণ। আর এ থেকে, মাঝে মাঝে লাভ করে নিতে পারে তৃতীয় পক্ষও। যেমন ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে, ফায়দা হতে পারে রাশিয়ার। বর্তমানে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার কারণে হুমকি সৃষ্টি করেছে। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই অস্থিরতা রাশিয়ার অর্থনীতিতে লাভ আনতে পারে। মস্কো সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় তখন, যখন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, কিন্তু সেটি আর পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে পরিণত না হয়ে কেবল জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। গত রবিবার, ইরানের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন করে। কিন্তু প্রণালিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ যার মাধ্যমে ইরান, সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যবহার করে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এই খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১.৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর, তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৬৭.৩০ ডলার ব্যারেলপ্রতি। দাম কমে দাঁড়ালেও, এখনো এই মূল্য অনেকটাই উঁচু, কারণ সংঘাত শুরু হওয়ার আগে, ব্যারেলপ্রতি এই মূল্য ছিল ৬৬.৬০ ডলার।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও এখনো ইরান ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি। ফলে অঞ্চলটিতে পরিস্থিতি অনিশ্চিত। মঙ্গলবার ভোরেও উভয় পক্ষ গোলাগুলি চালিয়েছে। সোমবার, গোল্ডম্যান স্যাক্স পূর্বাভাস দেয়, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন অর্ধেকে নেমে আসে, তাহলে ব্রেন্ট তেলের দাম সাময়িকভাবে ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। তারা ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে গড়ে ৯৫ ডলার ব্যারেলপ্রতি মূল্যের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা মার্চ মাসে দেওয়া বার্ষিক গড় ৭৮ ডলার পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, হরমুজ প্রণালিতে মালবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে রাশিয়া কীভাবে ফায়দা পেতে পারত? ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, জ্বালানি রপ্তানির বিঘ্ন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে, যেখানে ইরান নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ১.৪ কোটি ব্যারেল তেল যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার মধ্যে ইরানের নিজস্ব রপ্তানি অন্তর্ভুক্ত।

কিছু দেশের বিকল্প রুট আছে। যেমন, সৌদি আরব রেড সি-র বন্দর ব্যবহার করে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করতে পারে এবং ইরাক কুর্দিস্তানের পাইপলাইন দিয়ে তেল পাঠাতে পারে। তবে এখনো বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (খঘএ) হরমুজ প্রণালি ছাড়া পরিবহন অসম্ভব। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থা (ঊওঅ) অনুযায়ী, ‘প্রণালি দিয়ে যেসব জ্বালানি পণ্য পরিবাহিত হয়, সেগুলোর বেশিরভাগেরই বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা নেই, যদিও কিছু পাইপলাইন আছে যা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যেতে পারে।’ রাশিয়া দুটি উপায়ে এই সংকট থেকে লাভ করতে পারে : এক. তেল সরবরাহে ঘাটতি হলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাবে। এর মানে, রাশিয়ার তেলের দামও বাড়ে এবং পশ্চিমা দেশগুলো নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগে দেরি করতে পারে। দুই. রাশিয়া-চীনের বাজারে মধ্যপ্রাচ্য জায়গা নিতে পারে। ঊওঅ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ৮৪ শতাংশ জ্বালানি পণ্য গেছে এশিয়ার বাজারে প্রধানত চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। ২০২৫ সালের মে মাসে চীনা শুল্ক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাশিয়া ছিল চীনের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী (৩.৮৮ মিলিয়ন), তারপর সৌদি আরব (২.৮৪  মিলিয়ন) ও ইরাক (২.৬৯ মিলিয়ন)।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়া তেলের দাম কতটা বাড়াতে পারত? এখনো মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা থেকে রাশিয়া কতটা লাভ করতে পারবে, তা নির্ভর করছে বিক্ষিপ্ত সংঘাতের সময়কাল ও তীব্রতার ওপর। বিশ্লেষক আলিওনা নিকোলায়েভা বলেন, রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি লাভ হবে যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিন্তু  তা যদি সীমিত মাত্রায় হয় যাতে জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা না লাগে। মে মাসে ইউরালসের দাম ছিল ৫২ ডলার এবং ব্রেন্টের চেয়ে তাতে ৬ ডলার ছাড় ছিল। বিশ্লেষক পাভেল রিয়াবভ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে মৃদু হলেও ইরান-ইসরায়েল সংঘাত হয়তো চলতেই থাকবে।’

তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে রাশিয়ার বাজেট ও যুদ্ধ তহবিল উপকৃত হবে। বর্তমানে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে আয় নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার কারণে কমে গেছে। মে মাসে রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জ্বালানি রাজস্বের পূর্বাভাস ২৪ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এই দেশ প্রতিদিন প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। যদি রাশিয়ান তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলার বাড়ে, তাহলে তা মাসে অতিরিক্ত ২.৮ বিলিয়ন রাজস্ব আনতে পারে। যদি এই দাম ৬ মাস থাকে, তাহলে রাশিয়া অতিরিক্ত ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। যদিও এটি বাজেট বিপ্লব ঘটাবে না, তবে বছরের ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে। প্রসঙ্গত, গত বছর রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি ছিল ৩.২ ট্রিলিয়ন রুবল, অর্থাৎ প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার। মনে রাখতে হবে, ইউক্রেন যুদ্ধ তিন বছরের বেশি হয়ে গেলেও ভøাদিমির পুতিনের ক্ষমতা দুর্বল হয়নি। বরং, নিজেদের সম্পদের ওপর স্বনির্ভরতা বাড়াতে বিপুল আয়তনের দেশটি নিত্যনতুন সম্পদ ও উপায় খুঁজে নিয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দেশটি বিশ্ব মানচিত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এমতাবস্থায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাশিয়া আন্তর্জাতিক চাপের থোড়াই কেয়ার করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর দায় চুকাতে হবে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের দরিদ্র মানুষদের।

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক

  faizbsu006@gmail.com