দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল

২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ড একটি ‘দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের’ ফল বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিশনের সভাপতি বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন তদন্ত প্রতিবেদনের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছে, যা বর্তমানে কমিশনের সদস্যরা পর্যালোচনা করছেন। কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে এটি ছিল ষড়যন্ত্র। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নানা মাত্রার সংশ্লিষ্টতার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

গতকাল বুধবার পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকান্ড তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তৃতীয় সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান কমিশনের সভাপতি। তিনি বলেন, ৮ জন সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনের সাক্ষাৎকার জেলে নেওয়া হয়েছে। ৩ জন উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২ জন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ইমেইলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিশন দুজন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতার সাক্ষ্য নিয়েছেন। ওই দুই নেতা ইমেইলে তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা  হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী মির্জা আজম।

মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, এই ঘটনার পর বেঁচে ফিরে আসা ১৫ জন অফিসারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০ জন বেঁচে যাওয়া অফিসারকে লিখিত জবানবন্দি দেওয়ার জন্য সেনা সদরের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলে, এর আগে দুটি সম্মেলনে তাদের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে। ৫৫ জন সামরিক অফিসার যারা বিভিন্নভাবে পিলখানা ট্র্যাজেডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন একাধিক সাবেক সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান, বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ২০ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক, আমলা ও পূর্বতন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

তিনি আরও বলেন, তৎকালীন আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি যাদের কাছে ঘটনা সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। তিনি বলেন, কারাগারে দন্ডপ্রাপ্ত ২৫ জন বিডিআর সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত সে সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য দিয়েছেন যেগুলো এখন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আরও সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান। এছাড়া ২৯ জন কারামুক্ত বিডিআর সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

মোট সাক্ষ্য গ্রহণ বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, সর্বমোট ১৫৮ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৫০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি আছে। এই তদন্তে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। ৬টি দেশের দূতাবাস ও ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কমিশন জানায়, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নানা মাত্রার সংশ্লিষ্টতার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকান্ডটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল বলেই কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে এটিও স্পষ্ট যে, রাজনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের নামে অযথা কালক্ষেপণ এবং সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে বিদ্রোহীরা নির্বিঘ্নে হত্যাকান্ডও অন্যান্য অপরাধ সংঘটন করতে পেরেছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই পিলখানার ভেতরে আটকেপড়া অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বারংবার অনুরোধ ও আকুতি সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কমিশন জানায়, তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি এবং অপরাধ সংঘটনের সময় তারা নিষ্ক্রিয় ছিল, যার ফলে তারা বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ড প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়।

ফজলুর রহমান বলেন, তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে প্রতীয়মান হয়েছে। গোয়েন্দা ব্যর্থতার স্বরূপ ও কারণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং আলামত ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল বলেও প্রতীয়মান হয়েছে। এর পেছনে দায়ী ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

কমিশন প্রধান জানান, পিলখানায় হত্যাযজ্ঞ চলাকালে কিছু গণমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে বিদ্রোহে উসকানি দিয়েছিল এবং একই সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সেনা কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালিয়েছিল বলেও প্রতীয়মান হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদেশি সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেগুলো যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কমিশন মনে করে যে সময়মতো সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই নৃশংস হত্যাকান্ড ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ করা যেত। কমিশন প্রধান আরও বলেন, প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং তদন্ত কার্যক্রমের প্রয়োজনে কমিশন ৩৩ জন ব্যক্তির দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পলাতক ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কমিশন তিনটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

তদন্তে সময় বৃদ্ধি চায় কমিশন : সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ৫০ জনের অধিক ব্যক্তির সাক্ষ্যগ্রহণ এখনো বাকি আছে। এ ছাড়া কিছুসংখ্যক ব্যক্তির পুনঃসাক্ষ্য গ্রহণেরও প্রয়োজন হবে। গৃহীত সাক্ষ্যগুলোর পূর্ণাঙ্গ লিখিত রূপ প্রস্তুত, স্বাক্ষর গ্রহণ ও বিশ্লেষণের কাজ চলমান রয়েছে। এটি একটি সময়সাপেক্ষ কাজ। কিছু বিদেশি দূতাবাস ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। যার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের মেয়াদ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।