মধ্যপাড়ায় পড়ে আছে ৪০০ কোটি টাকার পাথর

দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল পাথর খনি পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া। খনির উৎপাদিত পাথর ব্লাস্ট ও বোল্ডারের অন্যতম ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান খনির সেই পাথর ব্যবহার না করায় মধ্যপাড়ায় এখন পাথরের স্তুপ। রবিবার (২৯ জুন) পর্যন্ত মধ্যপাড়া খনির ১৪টি ইয়ার্ডে মজুদ রয়েছে ১২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন পাথর।

জানা গেছে, মধ্যপাড়া খনিতে উৎপাদিত পাথরের ৫১ শতাংশ রেলপথে ব্যবহৃত বোল্ডার ও নদী শাসনের জন্য ব্লাস্ট পাথর। অথচ এই দুই সাইজের পাথরের বিক্রি নেই। বাকি ৪৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে ৭টি সাইজ, যেগুলো বছরে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৫ লাখ টন।

সম্প্রতি রেলের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাকিতে ব্লাস্ট পাথর সরবরাহ শুরু হয়েছে। নদীশাসন কাজে খনির বোল্ডার প্রচলিত ব্লকের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই, উন্নতমানের ও আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড মধ্যপাড়া বোল্ডার ব্যবহার করে না। বিগত সরকারের সময় থেকে রেলওয়ে বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে গত তিন বছর ধরে রেলপথে মধ্যপাড়ার ব্লাস্ট ও নদী শাসনে বোল্ডার পাথরের ব্যবহার কমে যায়।  

মধ্যপাড়া পাথর খনির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম জানান, রেলপথ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পাথর নিলে মজুদ হতো না। মধ্যপাড়ার পাথর যমুনা সেতুতে ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমানে দেশের মেগা প্রজেক্ট বন্ধ থাকায় এই পাথর ব্যবহার হচ্ছে না। আমদানি করা পাথরের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু বৃদ্ধি প্রয়োজন। এতে পাথরের বিক্রিতে সুবিধা হবে এবং দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথর খনিটিকেও বাঁচিয়ে রাখা যাবে। সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলে পাথর ব্যবহার বিষয়ে মধ্যপাড়ার দ্বিমুখি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। রেলের পূর্বাঞ্চলে অনুরূপভাবে চুক্তির বিষয়টি চলমান রয়েছে। তবে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আলোচনা চলছে অচিরেই মধ্যপাড়ার বোল্ডার অন্তর্ভুক্ত হবে।

খনির উপ-মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ রফিজুল জানান, বর্তমানে খনিতে ১২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন পাথর মজুদ রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকার সাড়ে ৯ লাখ মেট্রিক টন পাথর বিক্রি হয়েছে। তবে পাথর উত্তোলন কাজে বিস্ফোরক কিনতেই খরচ হয় ৩৭ শতাংশ টাকা, যেখানে আগে শূন্যের কোটায় ছিল। এছাড়া পূর্বের ঋণ মওকুফ ও মধ্যপাড়া রেলপথে ১৪ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কার হলে পাথর পরিবহনে খরচ কমবে। রয়্যালটি হার ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা দরকার। 

জানা যায়, খনিটি ২০০৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উৎপাদনে যায়। কিন্ত প্রতিদিন পাথর উত্তোলন হয় ৭ থেকে ৮শ’ মেট্রিক টন। এতে খনিটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর বেলারুশের জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)-এর সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়। জিটিসি ইউক্রেন, রাশিয়ান ও বেলারুশের সুদক্ষ মাইনিং বিষেশজ্ঞ দল ও দেশীয় শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে পাথর খনি থেকে দৈনিক সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করে। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি’র হাত ধরে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে মধ্যপাড়া পাথর খনিটি লাভের মুখ দেখতে শুরু করে। বর্তমানে সেটি টানা ৫ বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। 

খনি সূত্র জানিয়েছে, খনির দায়িত্ব গ্রহণের পর জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) নানা প্রতিকূলতা ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছে। সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জিটিসির দক্ষ ব্যবস্থাপনা বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ ও দেশীয় শ্রমিক দিয়ে খনিটিকে সচল রেখেছে। বর্তমান চুক্তিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক পাথর উত্তোলন করছে জিটিসি, যার পরিমাণ এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। 

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন জানান, চলতি অর্থবছরে ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে উৎপাদন খরচ, ভ্যাট ও আয়কর প্রদান করা হয়েছে। রেলপথ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পাথর ব্যবহার না করায় খনির ১৪টি ইয়ার্ডে মজুতকৃত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার লাভের পাথর পড়ে আছে। স্থানীয় ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে ক্রাসিং পয়েন্ট স্থপন করা হবে।