ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বিস্তৃত হচ্ছে!

সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ থেমেছে। পৌনে দুবছর ধরে গাজায় নির্বিচারে গণহত্যার পর ইসরায়েল অতর্কিতে তেহরানে হামলা করেছিল। বিমান ও মিসাইল হামলায় ইরানিদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে গাজা বা মধ্যপ্রাচ্যর অন্যান্য হামলার মতো এবার ইসরায়েল একপেশে ক্ষতি করে রক্ষা পায়নি। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল নিজের যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দম্ভ করত, ইরান তা ভেদ করেছে। তাদের মিসাইলগুলো ইসরায়েলের আয়রন ডোমকে ফাঁকি দিয়ে বেশ কিছু স্থাপনায় আঘাত করেছে। ইসরায়েলে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ প্রকাশে সংবাদমাধ্যমে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, ধারণা করা হচ্ছে সেখানে হতাহতও হয়েছে। ইসরায়েলে হামলার জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রাগার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, এর ফলে আগামী কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যর দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করতে সক্ষম হবে না। তবে, জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থার (আইএইএ) প্রধান বলেছেন, ইরান ‘কয়েক মাসের মধ্যেই’ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে বলেন, ইরানের তিনটি স্থাপনায় হামলা গুরুতর ক্ষতি করেছে, তবে তা মোটেও সম্পূর্ণ ধ্বংস নয়। তিনি বলেন, ‘খোলাখুলি বললে, কেউ বলতে পারে না যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে বা আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ইরান কয়েক মাসের মধ্যেই কিছু সেন্ট্রিফিউজ বসিয়ে সেগুলো চালু করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন শুরু করতে পারে, এমনকি তারও কম সময়ে। ইরানের সেই শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে।’ গ্রোসির এই মন্তব্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক এক মূল্যায়নের সঙ্গে মিলে যায়। যেখানে বলা হয়েছে, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবলমাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে। রয়টার্সকে একটি সূত্র জানিয়েছে, কর্মসূচিটি আবার চালু হতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তু। ইসরায়েল দাবি করে, তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা যা ইরান বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলায় যোগ দিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করে। কয়েকদিন ধরে প্রশ্ন উঠেছে, এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং তারা হামলার আগে কি তাদের প্রায় ৪০৮ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ স্থানান্তর করতে পেরেছিল কি না? গ্রোসি বলেন, ‘আমরা জানি না এই উপাদানগুলো এখন কোথায়? কিছু নিশ্চয়ই ধ্বংস হয়েছে, আবার কিছু হয়তো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে স্পষ্টতা দরকার।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতি ‘গুরুতর’, তবে বিস্তারিত এখনো পরিষ্কার নয়। রবিবার ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন না ইউরেনিয়াম মজুদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘ওটা খুব কঠিন কাজ, তাছাড়া আমরা তেমন আগাম সতর্কতাও দিইনি’, বলেন তিনি। ‘তারা কিছুই সরায়নি।’ গ্রোসির এমন মন্তব্য ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে ট্রাম্পকে বোঝাতে সহায়তা করবে যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায়।

বর্তমানে আইএইএর পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। যতদিন না দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নিশ্চিত হয় যে, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আর হামলা হবে না। এটি কার্যত পরমাণু অস্ত্র বিস্তার বিরোধী চুক্তি থেকে ইরানের প্রস্থানের কাছাকাছি এক অবস্থা। এই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গ্রোসির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি হামলার আগে ইরান সরকার আইএইকে অবিশ্বাসযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, কারণ সংস্থাটির একটি রিপোর্টে ইরানের অসহযোগিতার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল। ইরান মনে করে, সেই রিপোর্টটি ইসরায়েলের হামলার জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারা বলছে, গ্রোসির উচিত ছিল স্পষ্ট করে বলা যে আইএইএ কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি। আক্রমণের পর গ্রোসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ইরানে এমন কিছু পাইনি যা বলে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সক্রিয় ও পরিকল্পিত কর্মসূচি চলছে। রিপোর্টকে কোনোভাবে হামলার সবুজ সংকেত হিসেবে দেখানো সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।’ ইরানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত, তাই ইসরায়েলের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন।

রবিবার ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, ইসরায়েলের তেহরানের এভিন কারাগারে হামলায় অন্তত ৭১ জন নিহত হয়েছে। এই কারাগারে বহুদিন ধরে রাজনৈতিক বন্দি ও সরকারবিরোধীরা আটক ছিল। নিহতদের মধ্যে ছিল কর্মী, সৈনিক, বন্দি ও তাদের স্বজনরা। সেদিনই ইরান সরকার জানায়, তারা নিশ্চিত নয় যে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত মানবে। সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদোররহিম মুসাভি বলেন, ‘আমরা শত্রুর প্রতিশ্রুতি মানা নিয়ে সন্দিহান। আমরা জবাব দিতে প্রস্তুত।’ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, ইরান আগামী সপ্তাহে আলোচনায় অংশ নেবে কি না যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ঘরোয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের শর্তে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেবে। তবে ইরান এই শর্তে রাজি হয়নি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শনিবার তেহরানে বিপ্লবী গার্ডদের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন না এবং হামলার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তবে তার উপদেষ্টা আলি শামখানি উপস্থিত ছিলেন, যিনি প্রথম রাতেই ইসরায়েলি বোমায় নিজ বাড়িতে আহত হন। শামখানি জানান, তিনি তিন ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা ছিলেন। অক্সিজেন ভেন্টিলেটর দিয়ে শ্বাস নিচ্ছিলেন এবং প্রথমে ভেবেছিলেন ভূমিকম্প হয়েছে। পরে গাড়ির শব্দ শুনে বুঝতে পারেন তা বোমা হামলা। তিনি বলেন, ‘আমার পুরো ঘর ভেঙে পড়েছিল। কেন আমাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে তা জানে শত্রুরা, আমিও জানি। কিন্তু সেটা এখন প্রকাশ করতে পারি না।’ ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইরানে সরকারবিরোধী বিদ্রোহ উসকে দিতে চায়, কিন্তু সফল হয়নি। শামখানি বলেন, ‘শত্রুরা ভেবেছিল একটি হামলা দিয়েই তারা ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে।’ বাস্তবতা হচ্ছে, চলমান ঘটনার আরও বিস্মৃতি ঘটবে। তবে কোনোভাবেই যেন বিষয়টি পরমাণু যুদ্ধের দিকে না যায়, তার জন্য বিশে^র পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকে একত্র হয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক  

faiz@dhaka.net